আজ রাত ১১টায়, শৈল্পিক আর্জেন্টিনার মুখোমুখি শৃঙ্খল অস্ট্রিয়া

খবর ডেস্ক: বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মহারণ এখন মধ্যগগনে। ফুটবল রোমাঞ্চের এই মহোৎসবে আজ গ্রুপ সেরার লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপীয় ফুটবলের শৃঙ্খলাবদ্ধ দল অস্ট্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসের এটি অ্যান্ড টি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় শুরু হবে ‘জে’ গ্রুপের হাইভোল্টেজ এই ম্যাচটি। ডালাসের সবুজ গালিচায় যখন এ দুই দল মুখোমুখি হবে, তখন কেবল ৩ পয়েন্টের লড়াই নয়, বরং ফুটবল ব্যাকরণ ও রণকৌশলের এক অনবদ্য প্রদর্শনী দেখতে পাবে পুরো বিশ্ব। কাগজে কলমে আর্জেন্টিনা অনেকটা এগিয়ে থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে অস্ট্রিয়ার ফুটবলীয় উত্থান এই ম্যাচকে ঘিরে তৈরি করেছে টানটান উত্তেজনা।

আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবসময়ই অন্যতম সফল দল। তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন তারা, শিরোপা জিতেছে ১৯৭৮, ১৯৮৬ এবং ২০২২ আসরে। ২০২৬ আসরেও অন্যতম ফেভারিট হিসেবে মাঠে নেমেছে তারা। কোচ লিওনেল স্কালোনির দলটি অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের চমৎকার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। প্রথম ম্যাচে আক্রমণভাগের ধারালো ফুটবল এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ দেখে মনে হয়েছে, শিরোপা ধরে রাখার জন্য তারা পুরোপুরি প্রস্তুত। লিওনেল মেসিকে কেন্দ্র করে তার উত্তরসূরিদের নিয়ে গড়া বর্তমান আর্জেন্টিনা দলটির মূল শক্তি তাদের আক্রমণভাগ এবং মাঝমাঠের অবিশ্বাস্য বোঝাপড়া। কোচ স্কালোনির ক্ষুরধার মস্তিস্কে দলটির আক্রমণাত্মক ফুটবল এখন বিশ্বজুড়ে খুবই প্রশংসিত।

গত কয়েক বছর ধরে ল্যাটিন ঘরানার শৈল্পিক ফুটবলের সাথে আধুনিক পাসিং গেমের যে মিশেল আর্জেন্টিনা দেখিয়েছে, তা ধরে রাখাই হবে তাদের মূল লক্ষ্য। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে বল পজেশন ধরে রাখা এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ফাটল ধরানোর দায়িত্ব থাকবে দলের অভিজ্ঞ ও তরুণ তুর্কিদের কাঁধে। উইং দিয়ে গতিশীল আক্রমণ এবং ডি-বক্সের ভেতর চতুর পাসের মাধ্যমে গোল আদায় করে নিতে সিদ্ধহস্ত আলবিসেলেস্তেরা। তবে গ্রুপ পর্বের এই ম্যাচে কেবল আক্রমণ নয়, আর্জেন্টিনার জন্য বড় পরীক্ষা হবে অস্ট্রিয়ার কাউন্টার অ্যাটাক বা পাল্টা-আক্রমণ সামলানো। রক্ষণভাগের সামান্যতম ভুলও এই বড় মঞ্চে ডেকে আনতে পারে বিপর্যয়, তাই রক্ষণভাগে শতভাগ মনোযোগ ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ফুটবলের পাওয়ার ও হাই-প্রেসিং খেলার এক চমৎকার উদাহরণ বর্তমান অস্ট্রিয়া দল। তারা কেবল রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে ম্যাচ ড্র করার মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামে না, বরং প্রতিপক্ষকে চেপে ধরে ভুল করতে বাধ্য করায় তাদের জুড়ি মেলা ভার। অস্ট্রিয়ার মূল শক্তি তাদের শারীরিক সক্ষমতা, নিখুঁত ট্যাকলিং এবং মাঝমাঠের কঠোর পরিশ্রমী খেলোয়াড়রা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের সবচেয়ে উন্নতিশীল দলগুলোর একটি অস্ট্রিয়া। ইউরো এবং বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্সের পর এবার বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিতে চাইছে তারা। জর্ডানের বিপক্ষে তাদের গতিময় আক্রমণ, দ্রুত পাল্টা-আক্রমণ এবং সংগঠিত রক্ষণ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী দলের গতি রোধ করতে তারা এ ম্যাচের শুরু থেকেই মিডফিল্ডে কড়া ব্লকিং এবং হাই-লাইন প্রেসিংয়ের কৌশল বেছে নিতে পারে। অস্ট্রিয়ার ফুটবলাররা মূলত পাল্টা-আক্রমণ নির্ভর ফুটবলে অভ্যস্ত। প্রতিপক্ষের আক্রমণ নস্যাৎ করে দ্রুতগতির উইঙ্গারদের মাধ্যমে বল বাড়িয়ে ডিফেন্সকে ফাঁকি দেওয়া তাদের অন্যতম প্রধান শক্তির জায়গা। আর্জেন্টিনার হাই-লাইন ডিফেন্সের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অস্ট্রিয়া যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে সক্ষম।

ইতিহাস এবং পরিসংখ্যানের পাতা উল্টালে দেখা যায়, বিশ্বকাপে এ দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস বেশ সীমিত, যা এই ম্যাচটিকে আরও বেশি রহস্যময় ও রোমাঞ্চকর করে তুলেছে। ফুটবলের দুই ভিন্ন ঘরানার এ লড়াইয়ে একপক্ষে থাকবে ল্যাটিন আমেরিকার শৈল্পিক ফুটবল, ড্রিবলিং আর ক্ষিপ্র গতি; আর অন্যপক্ষে থাকবে ইউরোপের গতি, শারীরিক শক্তি আর নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল ডিসিপ্লিন। ফুটবলবোদ্ধাদের মতে, ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হবে মাঝমাঠের দখলের ওপর। যে দল মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পকেটে পুরতে পারবে, ম্যাচের লাগাম থাকবে তাদের হাতেই।

গ্রুপ পর্বের সমীকরণে এই ম্যাচের গুরুত্ব অপরিসীম। নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করতে এবং গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে যেতে দু’দলের জন্যই এ ম্যাচটি অলিখিত ফাইনালের সমতুল্য। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা নিজেদের প্রথম ম্যাচে মেসির রেকর্ডগড়া হ্যাটট্রিকে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত সূচনা করেছে। অন্যদিকে অস্ট্রিয়াও পিছিয়ে নেই। জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে তারাও আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে রয়েছে। ফলে দু’দলের এ লড়াইকে ইতোমধ্যেই গ্রুপের ‘ফাইনাল’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের চোখ আজ স্টেডিয়ামের সবুজ চত্বরে থাকবে। যেখানে ফুটবলের নিখুঁত সৌন্দর্য্য আর মাঠের তীব্র লড়াই মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে।

এখন দেখার বিষয়, আলবিসেলেস্তেরা তাদের রাজকীয় ছন্দ ধরে রেখে শেষ হাসি হাসে, নাকি অস্ট্রিয়া তাদের লড়াকু ফুটবল দিয়ে কোনো বড়সড় অঘটনের জন্ম দেয়। সব মিলিয়ে, এক পরম ফুটবলীয় বিনোদন ও উৎকণ্ঠায় মোড়ানো ৯০ মিনিটের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে গোটা ফুটবল বিশ্ব। ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষায় আছেন- বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের শক্তির প্রদর্শনী দেখবেন, নাকি জন্ম নেবে নতুন এক ইউরোপীয় রূপকথা।ই

মন্তব্য করুন