
অনলাইন ডেস্ক: অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় অ্যাফিলিয়েশন দেখে তাকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মঙ্গলবার সিলেটের সার্কিট হাউস মিলনায়তনে জেলা প্রশাসন আয়োজিত ‘জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উন্নয়ন সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায়’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিলেট অঞ্চলের সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাচালানিদের তালিকা সম্পূর্ণ নির্মোহভাবে তৈরির নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের পরিচয় সবার জানা আছে। তাই কোনো নিরীহ মানুষকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হয়রানি করতে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। একইভাবে কোনো প্রকৃত অপরাধীকে রাজনৈতিক বিবেচনায় তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না।
আগামী এক মাসের মধ্যে এ নির্দেশনার দৃশ্যমান ফলাফল উপস্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশ বাহিনীতে ‘রিওয়ার্ড ও পানিশমেন্ট নীতি’ চালু করা হয়েছে। রেঞ্জ পুলিশ ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশকে (এসএমপি) এ নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেন তিনি।
…..
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-পরবর্তী বিভিন্ন মামলা পর্যালোচনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনেক মামলার এজাহারে ঢালাওভাবে ৫০০, ১ হাজার বা ২ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার মামলা না করলেও তৃতীয় পক্ষ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি, ব্যবসায়ী হয়রানি বা চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে মামলা করেছে। এতে প্রকৃত ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরামের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, তার পরিবার বাদী হতে না পারলেও রাজনৈতিক আরেক ব্যক্তি বাদী হয়ে দেড় হাজার আসামি করেছিলেন। অথচ ভিডিও ফুটেজ ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণের মাধ্যমে প্রকৃত জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব ছিল।
এ প্রেক্ষাপটে সিলেট রেঞ্জ ও মেট্রোপলিটন এলাকার সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুযায়ী নিরীহ ও অযথা হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে এ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের দেনদরবার বা অনৈতিক লেনদেন না করার বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি। প্রকৃত নির্দেশদাতা ও অপরাধীদের যেন কোনোভাবেই বাদ দেওয়া না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন।
সিলেটের বালি ও পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকায় পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তার নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটি কাজ করছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং আদালতের নির্দেশনা সমন্বয় করে প্রস্তুত করা রেজুলেশন বা কার্যবিবরণী অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এ সংক্রান্ত আদালতের মামলার দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত আইনি জটিলতা নিরসনের নির্দেশ দেন তিনি। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় পাহাড়ি ঢলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও পরিবেশের ক্ষতি রোধে মনিটরিং টিমের মাধ্যমে সার্বিক তদারকি জোরদারের আহ্বান জানান।
‘মব’ বা অরাজকতা সৃষ্টির অপসংস্কৃতি সরকার কোনোভাবেই সহ্য করবে না উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দাবিদাওয়া আদায়ের নামে সড়ক অবরোধ বা ঘেরাও না করে প্রচলিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্মারকলিপি প্রদান বা প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে বিষয়গুলো উপস্থাপন করতে হবে। ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে মবের ঘটনা ৫০ শতাংশের বেশি কমেছে উল্লেখ করে সিলেট অঞ্চলকেও সম্পূর্ণ মবমুক্ত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সিলেটকে মাদকমুক্ত করতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নে পুলিশ প্রশাসনকে সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স দেখাতে হবে। সাধারণ মাদকসেবীদের পেছনে না ছুটে শীর্ষ অন্তত ৫০ জন মাদক কারবারির একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, দেশের ভৌগোলিক আয়তনে সর্ববৃহৎ মেট্রোপলিটন পুলিশ এলাকা হিসেবে এসএমপির লজিস্টিক সংকট দূর করতে হবে। পাশাপাশি নতুন পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন ও পর্যাপ্ত পুলিশি যানবাহন সরবরাহের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে প্রতিটি পুলিশ ইউনিটকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
মতবিনিময় সভায় সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মালেক, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী, সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান এবং বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বক্তব্য দেন।
এ সময় সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট বিভাগীয় কমিশনার মোঃ মশিউর রহমান, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম, জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন, পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মোঃ যাবের সাদেকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের অপরাধ দমনে পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার এবং অপরাধীদের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দিকনির্দেশনা দেন।ই










