সংশোধনী ছাড়া সাইবার সুরক্ষা আইন হলে দেশ বৃহৎ কারাগারে পরিণত হবে : মতিউর রহমান চৌধুরী

সাংবাদিকদের গ্রেফতারের আগে আদালতের অনুমতি নেয়ার প্রস্তাবটি সাইবার সুরক্ষা আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
অনলাইন ডেস্ক: প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়ায় আরো সংশোধনী আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা। অপপ্রয়োগের আশঙ্কা করে তাঁরা আইনটি সংশোধনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের জন্য সুরক্ষার দাবি করেছেন। গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো দেখার জন্য তাঁরা গণমাধ্যম কমিশন করে সেই কমিশনের মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহার দাবি করেছেন। এ বিষয়ে দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, আমি মনে করি, সংশোধনী ছাড়া যদি এ আইন পাস হয়, তাহলে বাংলাদেশ বৃহৎ কারাগারে পরিণত হবে।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার আগে, গ্রেফতারের আগে আদালতের অনুমতি নেয়ার প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য। সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়া কমিটিতে এটি সুপারিশ করা হলে সেটি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বহুল আলোচিত-সমালোচিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনায় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অংশীজনদের সঙ্গে গতকাল সচিবালয়ে সরকারের উদ্যোগে দ্বিতীয় পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় দেয়া বক্তব্যে মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী এ কথা বলেন। এতে আরো বক্তব্য দেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্সের (অ্যাটকো) মহাসচিব ও একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, বিজেসির সদস্য সচিব ইলিয়াস হোসেন, ইন্ডিপেনডেন্ট টিভির বার্তা প্রধান মোস্তফা আকমল, আমার দেশের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জাহেদ চৌধুরী, ইআরএফের সাবেক সভাপতি শারমিন রিনভি।

সাংবাদিকদের বক্তব্যের পর পর বিষয়টি নিয়ে সরকারের অবস্থান সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সভায় উপস্থিত ছিলেন, ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী ও তথ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ।

মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে আমি খুব আতঙ্কিত। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা যে বক্তব্য দিয়েছেন তা তো ভয়াবহ। উপদেষ্টার এ বক্তব্যের পর তো এ নিয়ে আলোচনা অর্থহীন। সংশোধন ছাড়া যদি এই আইন পাস হয়, তাহলে বাংলাদেশ একটি বৃহৎ কারাগারে পরিণত হবে।

মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, প্রস্তাবিত আইনে বেশ কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যেগুলোর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। সংজ্ঞা না থাকলে এসব বিধান বিভিন্নভাবে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। মোবাইল কোর্টের বিধান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মতিউর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, একজন প্রতিবেদক কোনো প্রতিবেদন করার পর তাকে যদি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সাজা দেয়া হয়, তাহলে সেটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য বড় প্রশ্ন তৈরি করবে। আমাদের ধারণা এবং আমাদের যে বিষয়, মোবাইল কোর্টের প্রভিশনটা সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত। সাইবার সুরক্ষা ও গণমাধ্যম নিয়ে এ ধরনের মোবাইল কোর্টের বিধান কীভাবে প্রস্তাবিত আইনে এলো, সেটি বড় প্রশ্ন। খসড়াটি কারা এবং কী চিন্তা থেকে তৈরি করেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়া দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আইনটি এভাবে পাস হলে গণমাধ্যমের ওপর বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে। তিনি বলেন, সরকার আইনটি নিয়ে আরো আলোচনার সুযোগ দেয়ায় তারা আনন্দিত। সাইবার সুরক্ষা বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ গ্রুপ এবং গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে সম্পাদক পরিষদসহ একটি গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এসব গ্রুপের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রস্তাব দেয়া হবে। মাহফুজ আনাম বলেন, বর্তমান প্রযুক্তির কারণে সবাই সাইবার জগতের অংশ। গণমাধ্যমের অনলাইন, মাল্টিমিডিয়া ও ডিজিটাল কার্যক্রম রয়েছে। তাই সাইবার অপরাধীদের শাস্তি দিতে গিয়ে এমন কোনো আইন করা উচিত নয়, যাতে শেষ পর্যন্ত গণমাধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তিনি বলেন, সরকার গণমাধ্যমকে প্রস্তাব দেয়ার সুযোগ দিয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যম এবং সাইবার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এমন প্রস্তাব দেয়া হবে, যাতে গণমাধ্যমের পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত হয় এবং সাংবাদিকরা আরো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন।

একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান ও সিইও আব্দুস সালাম বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইনের আওতায় কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কারো পছন্দ না হলে বা কেউ মনে করলে তার মানহানি হয়েছে, সেই অভিযোগে সাংবাদিককে গ্রেফতার বা কারাগারে পাঠানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়। তিনি বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইন দরকার আছে। সেটা হচ্ছে যারা সাইবার জগতে বিভিন্ন ধরনের ক্রাইম করে তাদের জন্য। এখন যদি সেটা মিডিয়ার ওপর পড়ে, ধরেন আপনার একটা রিপোর্ট করছেন বা কেউ ক্ষুব্ধ হলো, সে এখন আপনার ওপর মামলা করে দিলো, মালিকসহ মামলা করে দিলো, সে অ্যারেস্ট হলো বা মোবাইল কোর্ট যদি থাকে, আপনার সাথে সাথে ধরেন আপনি রিপোর্ট করলেন, আপনি রাস্তায় যাচ্ছেন, আপনাকে ধরে নিয়ে গেল। তো এটা তো হতে পারে না। এভাবে সাংবাদিকদের ওপর আইন প্রয়োগ হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হবে। সাইবার অপরাধ দমনে আইন প্রয়োজন হলেও মূলধারার গণমাধ্যম, ডিজিটাল মিডিয়া এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। মিডিয়ার ফ্রিডম থাকতে হবে এবং আমাদের সুরক্ষাও থাকতে হবে, প্রোটেকশনও থাকতে হবে।

সবার বক্তব্য শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার আগে, গ্রেফতারের আগে আদালতের অনুমতি নেয়ার প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য বলে মনে করি। সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়া কমিটিতে এটি সুপারিশ করা হলে সেটি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট যাতে নিবর্তনমূলক কোনো আইনে পরিণত না হয়, সেজন্য আমরা সমাজের সর্বস্তরের মতামত গ্রহণ করার জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছি খসড়া বিলটা। দেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রিন্ট অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সব প্রতিনিধি, সম্পাদক, বিশিষ্ট সাংবাদিকসহ আমরা সংবাদপত্রের সংগঠন ও জার্নালিস্টদের বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশন প্রতিনিধি, সবার সঙ্গে কথা বলেছি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আজকের সভায় প্রস্তাব এসেছে যে, আমরা যেন আরেকটু সময় নিয়ে যারা মিডিয়া এবং সাইবার এক্সপার্ট তাদের মতামত নিই এবং মিডিয়া যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, এই আইনে ভিকটিমাইজড না হয় সেজন্য আমরা কিছু প্রটেকশন যাতে রাখি বা সেভিং ক্লজ রাখি, সেটার ব্যবস্থা করার জন্য। আমরা এটা গ্রহণ করেছি। আমরা মিডিয়াকে টার্গেট করে এই আইনটা করতে চাইনি, চাই না এবং কোনো সাংবাদিক এটার শিকার হোক, এই আইনের অপপ্রয়োগ হোক, সেটা আমরা চাই না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা এমন একটা আইন করতে চাই, যে আইনের মাধ্যমে আমরা সমাজের সর্বস্তরের লোকজনকে রক্ষা করতে পারব, বিশেষ করে আমাদের যুবসমাজ, তাদের আমরা রক্ষা করতে পারব। যারা এই সাইবার স্পেস ব্যবহার করে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটন করছে এবং সমাজে সেটা মারাত্মক আকারে সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে, সেখান থেকে আমাদের উত্তরণ হতে হবে।ই

মন্তব্য করুন