কুমিল্লা নগরীর যত গলি, তত কিশোরগ্যাং

অনলাইন ডেস্ক: সন্ধ্যা নামলেই কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন গলি, বিনোদনকেন্দ্র ও ব্যস্ত সড়কের পাশে জমে ওঠে কিশোরদের আড্ডা। কারো হাতে মোটরসাইকেলের চাবি, কেউ ব্যস্ত মোবাইল ফোনে। বাইরে থেকে সাধারণ আড্ডা মনে হলেও এসব জটলার আড়ালেই গড়ে উঠেছে কিশোরদের বিভিন্ন দল ও উপদল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব গ্রুপের সদস্যদের জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে সংঘর্ষ, ছিনতাই, মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে। নগরীর একটি-দুটি এলাকা নয়, ছড়িয়ে পড়েছে পুরো শহর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায়।

কুমিল্লায় কোথায় কতগুলো গ্রুপ আছে? তাদের কর্মকাণ্ড, নেতৃত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতায় কারা, পুলিশ ও প্রশাসন কী করেছে—এসব জানতে গত এক সপ্তাহ অনুসন্ধান চালায় আমার দেশ। এতে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য।‌

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লার ১৮টি উপজেলায় ৫০টির বেশি ছোট-বড় কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব রয়েছে। শুধু কুমিল্লা নগরীতেই সক্রিয় রয়েছে ২০টির বেশি প্রধান গ্রুপ। এসব গ্রুপের রয়েছে বিভিন্ন উপদল ও নিজস্ব নেটওয়ার্ক।

নগরীর চর্থা, কাটা বিল, ধর্মপুর, শাসনগাছা, ছোটরা, ভাটপাড়া, কালিয়াজুড়ি, সংরাইশ, অশোকতলা, ঠাকুরপাড়া, টমছমব্রিজ, সুজানগর ও রেসকোর্স এলাকায় তাদের উৎপাত সবচেয়ে বেশি বলে জানা গেছে।

কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে সাম্প্রতিক নতুন করে আলোচনায় আসে গত ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের পর। ওই ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে এলে নগরীতে সক্রিয় বিভিন্ন গ্রুপের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

এরপর প্রশাসন জেলাজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। পুলিশ সূত্র জানায়, গত তিন দফার অভিযানে ১২৯৩ জনকে আটক করা হয়েছে।

যেখান থেকে উৎপত্তি
কুমিল্লা নগরীর ব্যস্ততম এলাকা কান্দিরপাড়ের পাশেই রয়েছে নগরীর অন্যতম প্রধান বিনোদনকেন্দ্র ধর্মসাগর পাড় ও নগর উদ্যান। প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এখানে ভিড় করেন হাজারো মানুষ। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর এ এলাকায় কিশোরদের বিভিন্ন গ্রুপের আড্ডা বেড়ে যায়। এতে করে আগের মতো স্বস্তিতে সময় কাটানো যায় না।

ধর্মসাগর এলাকায় ঘুরতে আসা বেশ কয়েকজন দর্শনার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বখাটেদের উৎপাতের কারণে অনেকেই পরিবার নিয়ে সেখানে সময় কাটাতে অস্বস্তি বোধ করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, নগরীর বিভিন্ন এলাকার কিশোরদের অনেকেই বিকালে ধর্মসাগরকেন্দ্রিক আড্ডায় জড়ো হয়। এ কারণে স্থানীয়দের কেউ কেউ এলাকাটিকে কিশোর গ্যাংয়ের ‘উৎপত্তিস্থল’ হিসেবেও উল্লেখ করেন।

তবে কিশোরদের এই গ্রুপগুলোর তৎপরতা ধর্মসাগর এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তাদের বিচরণ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

১৮ উপজেলায় ৫০টির বেশি গ্রুপ
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা জেলার ১৮টি উপজেলায় ৫০টির বেশি ছোট-বড় কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব রয়েছে। নগরীতে প্রধান গ্রুপের সংখ্যা ২০টির বেশি। এসব গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিভিন্ন উপদল ও নেটওয়ার্ক।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রুপগুলোর সদস্যদের একটি অংশ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, সংঘর্ষ, ছিনতাই ও মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এবং কারা এসব গ্রুপের নেতৃত্ব বা পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে স্পষ্ট হওয়ার বিষয়।

অভিযানে আটক ১২৯৩
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে পুলিশ সম্প্রতি ধারাবাহিক অভিযান শুরু করেছে। পুলিশ সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন দফায় মোট ১২৯৩ জনকে আটক করা হয়েছে।

প্রথম দুই দফায় আটকদের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ৫৯৭ জনকে মুচলেকা নিয়ে তাদের অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তৃতীয় দফায় আটক ৪১৫ জনের যাচাই-বাছাই এখনো চলমান।

তবে অভিযান ও আটকের পাশাপাশি কিশোরদের অপরাধপ্রবণতার পেছনের কারণ, গ্রুপগুলোর নেতৃত্ব, তাদের সম্ভাব্য পৃষ্ঠপোষকতা এবং এসব নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।

সক্রিয় দল ও উপদলগুলো
পুলিশ ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে প্রায় ১২টি প্রধান দল ও উপদলের নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে। এগুলোর মধ্যে সিবিকে (কুমিল্লা ব্রাদার্স কমিউনিটি) অন্যতম। এর রয়েছে বিভিন্ন উপদল; যেমন—সিবিকে ডেঞ্জার জোন, সিবিকে জুনিয়র, সিবিকে স্পেশাল)। আছে রতন গ্রুপ বা স্কোয়াড ঈগল আরডিএক্স, আরজেড-৩৬, সিডিএক্স, কিং স্কোয়াড, কেজিএস (কিং গ্যাংস্টার স্কোয়াড), রেড ৯৯৯, বিজিএম। এছাড়া কেবিজি ও কেএনএফ নামের গ্রুপের তৎপরতার তথ্যও রয়েছে।

যেসব অপরাধে জড়াচ্ছে
এসব গ্যাংয়ের সদস্যের নাম হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ছিনতাই এবং মোটরসাইকেল চুরির মতো অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে এসেছে। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের হাতে অন্তত ১২টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের প্রথম সাড়ে আট মাসেই ২৫টি বড় অপরাধের সঙ্গে এদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

কুবি শিক্ষিকার ছেলে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কিশোর গ্যাং জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার রতন গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড ধরা পড়লেও এখনো অধরা লিডাররা।

পুলিশের তথ্য মতে, গত শনিবার রাতে কুমিল্লা নগরের আলোচিত ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াড’-এর সক্রিয় ৪ সদস্য আছেন। তাদের একজন আনিসুর রহমান ওরফে আনিক (১৯) এই গ্যাংয়ের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’। পুলিশের দাবি, তাদের মধ্যে চারজন কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। চারজনই রতন গ্রুপের সক্রিয় সদস্য।

পুলিশের ভাষ্য, আনিক রতন গ্রুপের প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনের ভাগনে। রতন বর্তমানে আত্মগোপনে থাকায় আনিকই গ্রুপটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতে সংঘটিত একটি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন অনিক। ওই মামলায় তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। পরে জামিনে বের হয়ে আবার গ্যাংয়ের নেতৃত্বে যুক্ত হন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

যাদের শেল্টারে চলছে
অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় বিভিন্ন দলের নেতারাই এসব কিশোর গ্যাং সদস্যদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। যখন যেই দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের ছত্রছায়ায় এরাই থাকে।

২০০৮ সালের পর থেকেই কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত শুরু হয়েছে। ২০১৫ সালের পর এক ডজন কিশোর গ্যাং গ্রুপ কুমিল্লায় প্রকাশ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগের নেতারা তাদের রাজত্ব ধরে রাখার জন্যই বখাটেদের মাধ্যমে কিশোর গ্যাং তৈরি করে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়েছিল।

বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতারা পলাতক থাকলেও এসব গ্যাং সদস্যরা বিএনপি নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রয়েছে। গত এক সপ্তাহে এমন কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি মো. মহসিন এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে দুটি কিশোর গ্যাং গ্রুপের লিডারের ছবি ভাইরাল হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত তিন দফা আটকদের ৯০ শতাংশই শিক্ষার্থী। এর মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝড়ে পড়ার হার ৬০ শতাংশ।

নাগরিক ভাবনা
কুসিকের সাবেক কাউন্সিলর কাজী গোলাম কিবরিয়া বলেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে পুলিশ শতভাগ কাজ করতে পারছে না। ১২৯৩ জন ধরলেন অর্ধেকের বেশি ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। যাদের ছেড়ে দিলেন তারা ধোয়া তুলসী পাতা। মিনিমাম একটা আইনের আওতায় আনা হলে ভয় পেতো।

বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির আইন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. নায়ীম আলীমুল হায়দার আইনের সুযোগ ও অপব্যবহারকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আইনে শিশুদের জন্য প্রথাগত জেলখানার পরিবর্তে সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানোর বিধান রাখা হয়েছে, যা নীতিগতভাবে প্রশংসনীয়। তবে স্থানীয় অপরাধী বা রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী এই আইনগত শিথিলতার সুযোগ নিয়ে কিশোরদের অপরাধে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। কারণ তারা জানে কিশোরদের সহজে গ্রেপ্তার বা দীর্ঘমেয়াদে আটক রাখা কঠিন।

তিনি আরো বলেন, গবেষণায় দেখা যায়, বেশির ভাগ কিশোর গ্যাং স্বতঃস্ফূর্তভাবে গঠিত হলেও দ্রুত তা স্থানীয় ‘বড় ভাই’ বা রাজনৈতিক প্রভাবশালী চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

কুমিল্লা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এই অভিযান। এই অভিযান বন্ধ কিংবা কাউকে ছাড়তে চাপ প্রয়োগ করা হলে আমরা নাম প্রকাশ করে দেব।

এ বিষয়ে কুমিল্লা কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর পিপি অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিঙ্কু বলেন, যাদের আটক করা হয়েছে তাদের বেশির ভাগের নামই আগেই মামলা ছিল। এছাড়া বাকিদের মুচলেকা দিয়ে অভিভাবকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, এভাবে চলতে পারে না। সামাজিকভাবেই আমরা এটিকে প্রতিরোধ করব।আ:দে

মন্তব্য করুন