
কলমে: কারিমা খাঁন দুলারী
খুলনা জেলা,
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির অস্থির সময়ে মধ্যপ্রাচ্য আবারও উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সংঘাত, পাল্টা হামলা, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান নিয়ে প্রতিদিনই নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং তার মিত্রদের ভূমিকা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সম্পর্ক বিদ্যমান। এই সম্পর্ককে ঘিরে সৌদি আরবের নিরাপত্তা প্রত্যাশাও কম নয়। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে মিত্রদের ভূমিকা কতটা নির্ভরযোগ্য—সেই প্রশ্ন যখন সামনে আসে, তখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতা নতুন করে ভাবতে হয়। বন্ধুত্ব ও কৌশলগত অংশীদারত্বের প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় মূলত দুঃসময়ের পরীক্ষায়।
আঞ্চলিক সংঘাত যখন তীব্র হয়, তখন সামরিক শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে দমন করার চিন্তা স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। কিন্তু শুধু শক্তি প্রয়োগ কি স্থায়ী সমাধান দিতে পারে? ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, অস্ত্রের মাধ্যমে কোনো সংঘাত সাময়িকভাবে থামানো গেলেও তার গভীরে থাকা রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধান না হলে অশান্তি আবার ফিরে আসতে পারে।
বিদ্রোহী গোষ্ঠী কিংবা সশস্ত্র শক্তির হামলা অবশ্যই একটি দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রের জনগণ ও ভূখণ্ড রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই। তবে প্রতিটি সংকটে সামরিক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ, আলোচনার পথ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি আঞ্চলিক সংঘাত মুহূর্তের মধ্যেই বৃহত্তর সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
আজ বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো—কোনো একটি সংঘাত যেন বৃহৎ শক্তিগুলোর সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে না পৌঁছে যায়। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; জ্বালানি, বাণিজ্য, খাদ্য, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই তার অভিঘাত পড়তে পারে।
বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা নিয়ে নানা আলোচনা ও সতর্কতা শোনা গেলেও আতঙ্ক ছড়ানোর চেয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগই হওয়া উচিত সবার প্রধান লক্ষ্য। যুদ্ধের ময়দানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয় ক্ষমতাবানরা, কিন্তু যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। একটি শিশুর নিরাপত্তা, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, একজন শ্রমিকের জীবিকা—সবকিছুই সংঘাতের আগুনে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
সৌদি আরবের বর্তমান সংকট তাই শুধু একটি দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি আন্তর্জাতিক মিত্রতা, কূটনীতি এবং বিশ্বশান্তির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কে কার পাশে দাঁড়াল, কে দূরে সরে গেল—এসব প্রশ্নের পাশাপাশি আরও বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে মানুষের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা যায়।
প্রতিশোধের রাজনীতি কখনো স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। শক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন প্রজ্ঞা, সংযম এবং দূরদর্শিতা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত পারস্পরিক দোষারোপের বাইরে গিয়ে উত্তেজনা কমানোর পথ খোঁজা এবং আলোচনার টেবিলকে শক্তিশালী করা।
আজ পৃথিবীর মানুষ যুদ্ধ নয়, শান্তি চায়; ধ্বংস নয়, নির্মাণ চায়। মরুভূমির আকাশে যেন আর আতঙ্কের ছায়া না থাকে, কোনো মায়ের চোখে যেন সন্তানের জন্য অশ্রু না ঝরে—এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
মিত্রতা যদি সত্যিই মানবতার কল্যাণে হয়, তবে তার প্রমাণ হোক সংকটের সময় শান্তির পাশে দাঁড়ানো। আর বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান—ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়, মানুষের জীবনের মূল্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন। কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো দেশের বিজয়ের চেয়ে মানবতার বিজয়ই সবচেয়ে বড় বিজয়।








