
অনলাইন ডেস্ক: দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে প্রায় দুই মাস ধরে অস্থিরতা চলছে। সরবরাহ সংকটের সুযোগে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকরা। এমন পরিস্থিতিতে এলপিজি বিক্রিতে কমিশন দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত শুনানিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারে আমদানি পরিচালনা, শ্রমিকদের মজুরি, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহন এবং মূলধনের ওপর নির্ধারিত রিটার্ন বিবেচনা করা হয়েছে। একইভাবে পরিবেশকের কমিশন প্রতি কেজিতে ৪ টাকা ১৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ৬৭ পয়সা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে প্রতিটি ১২ কেজির সিলিন্ডারে পরিবেশকের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বেড়ে হবে প্রায় ৮০ টাকা।
খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন প্রতি কেজিতে ৩ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ৫ টাকা ৮৩ পয়সা করার সুপারিশ করেছে কমিটি।
অর্থাৎ প্রতি সিলিন্ডারে শুধু কমিশন বাবদ ব্যয় ৪৫ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৭০ টাকা হবে। আমদানি পর্যায়ে অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও কিছুটা বাড়িয়ে ধরার সুপারিশ রয়েছে। তবে সৌদি আরামকোর ঘোষিত আন্তর্জাতিক বাজারদর এবং জাহাজভাড়া ও ট্রেড প্রিমিয়ামের বিদ্যমান হার অপরিবর্তিত ধরে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে।
মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে জাহাজভাড়াসহ এলপিজি আমদানির প্রিমিয়াম ছিল প্রতি টনে ৮০ থেকে ১২০ ডলার। এখন তা বেড়ে ২৫০ থেকে ৪০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে পরিচালন ব্যয়। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে দাম নির্ধারণ করা উচিত, যাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে এক টাকাও বেশি নিয়ে কেউ বাজারে এলপিজি বিক্রি করতে না পারে।
এদিকে, অনুমতি থাকা সত্ত্বেও আমদানি করতে না পারা কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে পাইকারি দাম নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
শুনানিতে ওরিয়ন গ্যাস লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার অনুপ কুমার সেন বলেন, নতুন পরিস্থিতিতে ১০টি কম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারছে না। ফলে তাদের অবকাঠামো অব্যবহৃত পড়ে আছে এবং বাজারে সিলিন্ডারের সংকট তৈরি হচ্ছে। অন্য কোম্পানির কাছ থেকে এলপিজি কিনে বিইআরসি নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে পাইকারি দাম নির্ধারণ করা হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি কমবে।
গণশুনানিতে বিইআরসি’র চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সংশ্লিষ্টদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিকতা বজায় রেখে এলপিজি দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জানা গেছে, দেশে সক্রিয় ৩৫টি এলপিজি কোম্পানির মধ্যে ২৩টির আমদানির অবকাঠামোগত সক্ষমতা রয়েছে। তবে গত মাসে আমদানি করেছে মাত্র ১০টি কোম্পানি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় এই সীমাবদ্ধতা বাজারের অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
পরিবেশকদের পক্ষ থেকে মেসার্স উজ্জল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মনি মুক্তা পাল বলেন, আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশকদের খরচও বেড়েছে। একই সঙ্গে অব্যবহৃত সিলিন্ডারের বোঝা বহন করতে হচ্ছে তাঁদের। এ পরিস্থিতিতে প্রতি সিলিন্ডারে পরিবেশকদের কমিশন ১৫০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানান তিনি। এ দাবি পূরণ না হলে বাজারে দাম কমানো কঠিন হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
অটোগ্যাসের কমিশন বাড়ানোর দাবি জানিয়ে এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল মাওলা বলেন, দেশে দুই লাখের বেশি গাড়ি এলপিজিতে চলে। ২০২১ সালে অটোগ্যাসের প্রতি লিটারে কমিশন ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর পাঁচ বছরে পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়েছে। রাজশাহীর একটি স্টেশনে মাসে ৪৫ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। শহরের কিছু স্টেশন মুনাফা করতে পারলেও প্রায় ৮০ শতাংশ স্টেশন লোকসানে রয়েছে। এ কারণে প্রতি লিটারে কমিশন ১১ টাকা করার দাবি জানান তিনি।
এর আগে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের ধর্মঘটের হুমকির মুখে কমিশন পুনর্নিধারণের উদ্যোগ নেয় বিইআরসি। এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর ১৪ অক্টোবর কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়। ওই দিনই গণশুনানির ঘোষণা দেয় বিইআরসি।
দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় করে আসছে বিইআরসি। তবে নির্ধারিত দামে বাজারে সিলিন্ডার বিক্রি না হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। চলতি মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও গ্রাহকদের কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায়।
শুনানির ৯০ দিনের মধ্যে সুপারিশ ও মতামতের ভিত্তিতে নতুন দাম দেওয়ার কথা বিইআরসির। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নভেম্বরের শুরুতেই নতুন দাম ঘোষণা দিতে পারে বিইআরসি।বা:প্র









