
নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা থাকলেও স্বাধীনতা নেই
অনলাইন ডেস্ক: চাঁদাবাজি এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। বিনা পরিশ্রমে সহজে অবৈধভাবে আয়ের পথ ‘চাঁদাবাজি’ এখন আমাদের গোটা সমাজে যেন একটি সিস্টেম হয়ে গেছে। বলতে গেলে পেশার আদলে রূপ নিয়েছে। প্রায় ৪ হাজার তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ আর ২ হাজার ৫শ’ সন্ত্রাসীর কাছে জিম্মি পুরো দেশ। সময়ের সাথে বেড়েছে চাঁদাবাজ ও চাঁদাবাজির ধরণ। নিছক পেটের ক্ষুধায় এরা চাঁদাবাজি করছে না। এখনকার চাঁদাবাজির উদ্দেশ্য শৌখিনতা, ভোগবিলাস আর প্রভাব বিস্তার। অপরাধ বিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী এবং আইন প্রয়োগকারী বিশ্লেষকদের মতে, চাঁদাবাজি কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অর্থ আদায় নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুষ্টচক্রের অংশ। তাদের মতে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চাঁদাবাজির মূল চালিকাশক্তি এখন রাজনৈতিক ক্ষমতা। দেশে ক্ষমতার পট-পরিবর্তন হয়, কিন্তু চাঁদাবাজির মূল কাঠামো থেকে যায় একই স্বরূপে। কেবল বদলে যায় এর সুবিধাভোগী ও নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী। চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীদের টার্গেটকৃত ব্যক্তি অপেক্ষাকৃত দুর্বল, অপরপক্ষে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশীশক্তি। এই বিপরীত মেরুকরনে টার্গেটকৃত ব্যক্তিটিই ভুক্তভোগী হতে বাধ্য হন। তাদের মতে, দেশ থেকে চাঁদাবাজি কখনোই বন্ধ হবে না যতক্ষণ না সরকারের সদিচ্ছা জাগে।
দেশের এমন কোনো খাত নেই যেখানে চাঁদাবাজি চলে না। পরিবহন খাত, ফুটপাত, স্বাস্থ্য ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, বাজার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সব সেক্টরের নিয়ন্ত্রণ চাঁদাবাজদের হাতে। সৎ উপায়ে ব্যবসা করলেও নীরবে চাঁদাবাজির শিকার হন ব্যবসায়ীরা। এমনও খবর এসেছে, চাঁদাবাজদের অত্যাচারে বিভিন্ন এলাকা থেকে নিজেদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী। অনেকে পেয়েছেন প্রাণনাশের হুমকি। চাঁদা দিতে অনীহা প্রকাশ কিংবা সন্ত্রাসী চাহিদা পূরণে বিলম্ব হওয়ায় হতাহতের সংখ্যাও অনেক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী শিক্ষক এ বি এম নাজিমুস সাকিব সাংবাদিকদের বলেন, চাঁদাবাজদের কোনো রাজনৈতিক দল বা পরিচয় নেই। তবে তারা শেল্টার নেয়। তাদের একমাত্র টার্গেট টাকা উপার্জন। সমাজ স্বীকৃত পথে আয় না করে তারা হুমকি দিয়ে সহজে টাকা নেয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় চাঁদাবাজদের পেছনের শক্তিতে রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় প্রশাসন হস্তক্ষেপে অনীহা প্রকাশ করে। তিনি আরো বলেন, যে কোনো ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের পুলিশের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু তাদের স্বাধীনতা নেই। সংবিধানে যে কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তিকে পুলিশ যে কোনো সময় জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। কিন্তু পুলিশের ব্যাকআপ নেই। পলিটিক্যাল পেট্রোনাইজ না থাকলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এজন্য সবার আগে সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। পুলিশ মাঠ পর্যায়ের মিড কিংবা লো লেভেলের অপরাধী ধরে চালান দেয়। আড়ালে থাকে তাদের গডফাদার চক্র। যারা নিজেদের কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর লোক হিসেবে পরিচয় দিয়ে হাট, ঘাট, বাজার ও পরিবহন খাত থেকে চাঁদা আদায় করছে। অবৈধ শক্তি এবং অবৈধ আয়ের স্বার্থে তারা ব্যবহার করছে তালিকায় শীর্ষ তালিকাভুক্ত অপরাধীদেরও। শুধু মাঠ পর্যায়ের ছিঁচকে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করলেই চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সমূলে আঘাত করতে হবে। এজন্য একমাত্র সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট।
সাম্প্রতিক সময়ে ফুটপাত, গণপরিবহন টার্মিনাল, নির্মাণাধীন ভবন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং জমি দখলকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ঢাকার ইসিবি চত্বর এলাকায় আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে চাঁদা দাবি এবং সংঘবদ্ধ হামলা, মিরপুর-১ এলাকায় অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও অফিস মধ্যরাতে ভাঙচুর ও লুটপাট, বাংলামোটরে চাঁদা না পেয়ে ফাঁকা গুলি ও মারধর, মোহাম্মদপুরে বাড়িতে ঢুকে দখলের চেষ্টা, আদাবরেও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, কুষ্টিয়ায় চরমপন্থী দলের নামে ৩০টি পরিবারকে চাঁদাবাজির চিঠি, চট্টগ্রামের চান্দগাঁও, বায়েজিদ, হাটহাজারীসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের এককালীন ও মাসিক চাঁদা দাবি করে ‘বড় সাজ্জাদ’ বাহিনীর সশস্ত্র হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-এসআরবি’র সূত্র বলছে, তাদের প্রত্যেকটি ব্যাটালিয়নের সর্বশেষ ১০ সেপ্টেম্বর হালনাগাদ তালিকা অনুযায়ী সারাদেশে চাঁদাবাজদের সংখ্যা ৩ হজার ৫৮৬ জন। আর আলোচিত সন্ত্রাসী ২ হাজার ২৫৮ জন। সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজের সংখ্যা নারায়ণগঞ্জে। এখানে চাঁদাবাজদের সংখ্যা ৫৬৫ জন। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ”ট্টগ্রাম। সেখানে চাঁদাবাজ রয়েছে ৫০৩ জন। ঢাকার শুধু উত্তরায় চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত ৩৯৩ জন। এরপরে মিরপুরে ৩৪৭ জন। কেরানিগঞ্জে চাঁদাবাজ রয়েছে ২৭৭ জন। আর বরিশালে ১৪৯, সিরাজগঞ্জে ২৪৭ এবং খুলনায় ২শ জন। এছাড়া আলোচিত ২ হাজার ২৫৮ সন্ত্রাসীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারায়ণগঞ্জে রয়েছে ৪০৮ জন। এর পরের অবস্থান সিরাজগঞ্জে ৩২৪, চট্টগ্রামে ২৭৭, ময়মনসিংহে ২৩৯, রাজশাহীতে ১২৬, খুলনায় ১২৪, ঢাকার কেরানিগঞ্জে ১শ এবং রাজধানীর অভ্যন্তরে ৩৫ জন। এসআরবি’র ব্যাটালিয়ন অনুসারে সংস্থাটি চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীর তালিকা হালনাগাদ করে শুধু সংখ্যার তথ্য দিলেও তারা এসব অপরাধীর নাম প্রকাশ করেনি। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞ মহল। এসআরবি’র পরিচালক উইং কমাণ্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী ইনকিলাবকে বলেন, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইনানুগ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণকে এসআরবি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। ইতিমধ্যে,এসআরবি বিগত সময়ে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সর্বমোট ১ হাজার ৯৮ টি অভিযান পরিচালনা করে ৩ হাজার ২৩২ জন চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়েছে। সারাদেশে গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী সবচেয়ে চাঁদাবাজি প্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে খিলক্ষেত, হাতিরঝিল, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, আদাবর, ভাটারা, খিলগাঁও, উত্তরা পূর্ব ও পল্লবী এলাকা উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় পরিচালিত চাঁদাবাজি, পেশাদার চাঁদাবাজি, কিশোর বা উঠতি বয়সী অপরাধীদের সম্পৃক্ততা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র— এসব বিষয় পৃথকভাবে চিহ্নিত না করে সকল প্রকার চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এসআরবি’র মূল লক্ষ্য হলো— সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখা এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখা। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী মহল আইনের ঊর্ধ্বে নয়— অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে তদন্তের ভিত্তিতে ডিএমপির তালিকায় উঠে এসেছে, রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও জমি-সম্পত্তি দখলে জড়িত এক হাজার ৫৩০ জনের নাম। তাদের মধ্যে ২৭৮ জনকে অপরাধের গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যার ২৩০ জনই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বর্তমান বা সাবেক নেতা-কর্মী। যদিও দলীয়ভাবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে যে দলের প্রকৃত ও আদর্শ নেতাকর্মী কেউ এগুলোর সঙ্গে জড়িত নয়। তবে চাঁদাবাজি এবং দলীয় শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের দায়ে ইতিমধ্যে অভিযুক্তদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
চাঁদাবাজির অভিযোগে গত ৪ অক্টোবর, রোববারই ঢাকার খিলক্ষেত থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি শাহিনুর আলম মারফতকে গ্রেফতার করেছে এসআরবি। খিলক্ষেত থানার ওসি সোহরাব হোসেন বলেন, চাঁদাবাজির অভিযোগে এসআরবি শাহিনুরকে আটক করে দুপুরে থানায় হস্তান্তর করে এসআরবি। পরে তাকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ মিন্টোরোডের কার্যালয়ে নিয়ে যায়। এর আগে মোহাম্মদপুরে ভুয়া পরিচয় দিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার বিএম ইব্রাহিম ওরফে ‘তালা ইব্রাহিমকে’ গ্রেফতার করে পুলিশ। বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগে তাকে আগেই যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
ঢাকার মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত থাকার প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা মেলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি গত ১ অক্টোবর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। দল থেকেও পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটের অভিযোগে শাহ আলী থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নূর আলমকে দারুস সালাম এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাকে যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
গত এপ্রিলে শ্যামলী এলাকার সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে শেরেবাংলা নগর থানার সাবেক যুবদল নেতা মো. মঈন উদ্দিন মঈনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ হাসপাতালটি পরিদর্শন করে জানিয়েছিলেন, অভিযুক্ত সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে এসব অপকর্ম করছেন। বাংলামোটর এলাকায় ওষুধ ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবি এবং ফাঁকা গুলি করার অভিযোগে হাতিরঝিল থানা যুবদলের বহিষ্কৃত আহ্বায়ক ফেরদৗস আহমেদ সাইমনকে গ্রেফতার করে রিমাণ্ডে নেয়া হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ স্পষ্ট করেছেন যে, অপরাধীর কোনো দলীয় রাজনৈতিক পরিচয় নেই। নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে এবং পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ বিষয়ে সক্রিয় রয়েছে। তিনি আরো বলেন, চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলমান। এই অভিযান আরো জোরদার করা হবে। সচেতন মহল বলছেন, চাঁদাবাজির শিকার ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যাতে তারা নির্ভয়ে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।সূ:ই









