
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে অধিকারের প্রতিবেদন:
কারাগারে মৃত্যু ৬৭ধর্ষণের শিকার ৬১৭ নারী ও শিশু
অনলাইন ডেস্ক: দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, কারাগারে মৃত্যু, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার। সংগঠনটির জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
এ ৩ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ২৯ জন নিহত এবং ১ হাজার ৯০ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ২২ জন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২২৯ জন নারী ও শিশু। এ ছাড়া কারাগারে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
৩১ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন ঘটনা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আইন সংস্কারের উদ্যোগ, রাজনৈতিক সঙ্ঘাত, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, শ্রমিকের নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। অধিকার জানিয়েছে, তাদের নিজস্ব মানবাধিকারকর্মীদের পাঠানো তথ্য ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও গণপিটুনি
অধিকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাইয়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১০ জন নিহত এবং ২০৩ জন আহত হন। আগস্টে নিহত হন ৯ জন, আহত ৪৭২ জন। সেপ্টেম্বরে নিহত আটজন এবং আহত ৪১৫ জন। তিন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার মোট ঘটনায় মাসভিত্তিক তথ্যানুযায়ী মোট নিহত ২৭ জন এবং আহত এক হাজার ৯০ জন।
প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে হামলার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ ও সহিংসতার একাধিক অভিযোগের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্ট সঙ্ঘাতের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য প্রতিবেদনে সর্বত্র পাওয়া যায়নি।
গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনাও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। তাদের হিসাবে জুলাইয়ে ৯ জন, আগস্টে ৯ জন এবং সেপ্টেম্বরে চারজন গণপিটুনিতে নিহত হন। তিন মাসে মোট নিহতের সংখ্যা ২২। তবে জানুয়ারি-সেপ্টেম্বরের সামগ্রিক হিসাবে এ সংখ্যা ৭৪।
অধিকারের পর্যবেক্ষণ, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই কিংবা ছেলেধরা সন্দেহে মানুষকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধও এ ধরনের সহিংসতার কারণ হয়েছে। বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা ও আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা এ পরিস্থিতিকে আরো বিপজ্জনক করে তুলছে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।
ধর্ষণ ও নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা
প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাইয়ে ৮৯ জন, আগস্টে ৬৪ জন এবং সেপ্টেম্বরে ৭০ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তিন মাসে মোট ২২৩ জন। এর মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ে শিশু ১৫০ জন এবং প্রাপ্তবয়স্ক নারী ৭৩ জন।
জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে যৌতুক সম্পর্কিত সহিংসতায় ২৩ জন নারী নিহত হয়েছেন। একই সময়ে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৪ জন এবং যৌতুক সহিংসতার সাথে সংশ্লিষ্ট আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে পাঁচটি। যৌন হয়রানি বা উত্ত্যক্তকরণের ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি।
অধিকার বলেছে- নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগ জরুরি। অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অপরাধের প্রতিকার কঠিন হয়ে পড়বে।
কারাগারে মৃত্যু ও বন্দীর চাপ
কারাগারের পরিস্থিতি নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ জানিয়েছে অধিকার। তাদের হিসাবে জুলাইয়ে কারাগারে পাঁচজন, আগস্টে তিনজন এবং সেপ্টেম্বরে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তিন মাসে মোট মৃত্যু ৩০টি। জানুয়ারি-সেপ্টেম্বরের সামগ্রিক পরিসংখ্যানে কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা ৬৭।
প্রতিবেদনে কারাগারে অতিরিক্ত বন্দী, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং বন্দীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ৭৫টি কারাগারে ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন হলেও বন্দী ছিলেন এক লাখ চার হাজার ৬১৭ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে; অর্থাৎ ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দী ছিলেন কারাগারগুলোতে।
কক্সবাজার কারাগারে এক বন্দীর মৃত্যুর ঘটনাও প্রতিবেদনে এসেছে। পরিবারের অভিযোগ, কারারক্ষীদের মারধরে ওই বন্দীর মৃত্যু হয়। তবে কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল, তার মৃত্যু হয়েছে হৃদথরোগে। অভিযোগটির নিরপেক্ষ তদন্তের ফল সম্পর্কে প্রতিবেদনে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেয়া হয়নি।
অধিকার বলেছে, বন্দীর অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তার অধিকার সংরক্ষণ, কারাগারে চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আইন সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিবেদনে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬ নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছে। অধিকারের মতে, গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের হাতে না থাকা এবং মিথ্যা অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর ৫ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান ভুক্তভোগীদের অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়েও সংগঠনটি প্রশ্ন তুলেছে। তাদের বক্তব্য, নতুন আইনে কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকর তদন্তক্ষমতা নিশ্চিত হয়নি। বিশেষ করে শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কমিশন নিজ উদ্যোগে তদন্ত করতে না পারার বিধান জবাবদিহির পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
এ ছাড়া র্যাবের পরিবর্তে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠন নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে অধিকার। সংগঠনটির দাবি, নতুন ইউনিটে র্যাবের জনবল, সম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় বাহিনী পরিবর্তনের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুরনো সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে।
সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়ায় মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন করা, বুলিং, গুজব ও অপতথ্য প্রচারের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবের সমালোচনাও করা হয়েছে। অধিকার মনে করে, এসব বিষয়ের অস্পষ্ট সংজ্ঞা আইনটির অপব্যবহার এবং ভিন্নমত দমনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় আইনটি খসড়া পর্যায়ে ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের হামলা, হুমকি, নির্যাতন এবং মামলার মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অধিকারের হিসাবে জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে একজন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার, ২২ জন আহত, ১৩ জন লাঞ্ছিত এবং ১৬ জন হুমকির শিকার হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারপ্রধানকে নিয়ে সমালোচনামূলক বা আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতার এবং তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী বা সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দেয়ার ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে।
অধিকারের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের সমালোচনা, সংবাদ সংগ্রহ এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা প্রচলিত আইনে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত করার হাতিয়ার হিসেবে আইন ব্যবহার করা উচিত নয়।
সীমান্তে হত্যা ও পুশইন
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। অধিকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে বিএসএফের হাতে ১১ বাংলাদেশী নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ৫৬ জনকে পুশইনের শিকার হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
শুধু জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে সীমান্তে বিএসএফের হাতে চারজন নিহত এবং ছয়জন আহত হয়েছেন। এ সময়ে পুশইনের ঘটনা ঘটেছে ২৯টি বলে প্রতিবেদনের মাসভিত্তিক হিসাবে উল্লেখ রয়েছে।
অধিকার এসব ঘটনাকে মানবাধিকার ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে। সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধ, অভিযোগের তদন্ত এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি।
জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ
অধিকারের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের সামগ্রিক পর্যবেক্ষণ হলো আইন ও প্রতিষ্ঠান সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হলেও মানবাধিকার সুরক্ষায় স্বাধীন তদন্ত, কার্যকর জবাবদিহি ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। গুম, হেফাজতে নির্যাতন, কারাগারে মৃত্যু, রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত হওয়ার অভিযোগের প্রতিকার না হলে নাগরিকের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রতিবেদনটির তথ্যানুযায়ী জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০২৬ সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে ১০টি মৃত্যু, গুমের দু’টি ঘটনা, কারাগারে ৬৭টি মৃত্যু, রাজনৈতিক সহিংসতায় ১০৯ জন নিহত ও দুই হাজার ৭৯২ জন আহত এবং গণপিটুনিতে ৭৪ জন নিহত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি। একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ৬১৭টি।
এসব পরিসংখ্যান মানবাধিকার পরিস্থিতির উদ্বেগজনক দিকগুলো সামনে আনলেও প্রতিটি ঘটনার দায়, প্রেক্ষাপট ও আইনি অবস্থান নির্ধারণে স্বাধীন তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার মাধ্যমেই মানবাধিকার সুরক্ষার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন সম্ভব।ন:দি










