অনলাইন ডস্ক: এক সময়ের শান্তির নগরী খুলনা একের পর এক হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনায় সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের ১০ মাসে ৭১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিদিন বাড়ছে খুনের তালিকা। মানুষ জিম্মি হয়ে পড়ছে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে। ২৮শে অক্টোবরের পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ৩টি এলাকায় ৩ জনকে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। এসব ঘটনায় অপরাধীদের একজনও গ্রেপ্তার হয়নি। ৫ দিনে খুলনা মহানগরীতে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে ২ জনকে। এ ঘটনার ৫ দিনেও কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি, উদ্ধার হয়নি কোনো অস্ত্র। প্রতিটি অপরাধ কর্মকাণ্ডের পেছনে নগরীতে সক্রিয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর নাম আসছে। এসব নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে নগরবাসী।
খুলনা মহানগর ও জেলা পুলিশের অপরাধ শাখা থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩শে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে খুলনায় গুলি, কুপিয়ে বা অন্য উপায়ে ৭১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬৯টি। বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের পেছনে অস্ত্র ও মাদক কারবার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, পূর্ব-শত্রুতা ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ কাজ করেছে।
এদিকে, গত বুধবারের পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় পৃথক ৩টি এলাকায় যুবদল ও ছাত্রদলের সাবেক দুই নেতা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ১ কর্মীকে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে। গুলিবিদ্ধরা হলেন- বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি অহিদুল ইসলাম বাদল ও আমিরপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সোহেল শেখ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সালমান হাওলাদার। এর মধ্যে সালমানের ল্যাপটপের ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় হামলাকারীরা। ওই ব্যাগে প্রতিদিন কর্মস্থলের টাকা নিয়ে ব্যাংকে জমা দিতে যেতেন তিনি। এসব ঘটনায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বেশ আগেই করা হয়েছিল বিভিন্ন বাহিনীর তালিকা।
তালিকা অনুযায়ী, একসময় নগরীতে ২০০টির বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। সময়ের সঙ্গে এসব গ্যাংয়ের অনেক সদস্যের বয়স বেড়েছে। তাদের একাংশ এখন বিভিন্ন অপরাধী বাহিনীতে যুক্ত হয়েছে বলে পুলিশের তথ্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়। পাশাপাশি নতুন বাহিনীরও আবির্ভাব ঘটেছে। ফলে অপরাধী চক্রের সদস্য ও পরিচয় বদলালেও তাদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণই এখন পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। গত ২২শে অক্টোবর মাত্র ১৩ ঘণ্টার ব্যবধানে নগরীতে গুলিতে নিহত হন দু’জন। ভোরে মিস্ত্রিপাড়া বাজারসংলগ্ন আনসার উদ্দিন লেনে তুষার (২৭) এবং সন্ধ্যায় লবণচরার জিন্নাহপাড়া বউবাজার এলাকায় খুশি বেগম (২৫) নামে এক গৃহবধূ নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ির সামনে মায়ের সঙ্গে থাকা খুশির কুশল জানতে চেয়ে পরপর তাকে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে দুর্বৃত্তরা। তার স্বামী সুমন সরদার এলাকায় ‘ব্লেড বাবু’ নামে পরিচিত। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মাদকসংক্রান্ত বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। দুই সন্তানের জননী খুশির হত্যায় নগরীতে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এ বছরের নগরীর আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে সোনাডাঙ্গার দারুল আমান মহল্লায় ট্রিপল মার্ডার। গত ৩০শে মে একটি ভাড়া বাসা থেকে নানী বেবি বেগম (৫৫) এবং তার দুই নাতি শামীম ব্যাপারী (১৩) ও মুস্তাকিমের (৪) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে ২০২৫ সালের ১৬ই নভেম্বর লবণচরার মুক্তা কমিশনারের কালভার্টসংলগ্ন একটি বাড়ি থেকে নানী ও দুই নাতির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। জেলার মধ্যে রূপসায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ৫ই অক্টোবর উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের দুর্জনীমহলে বাড়ির সামনে বসে থাকা অবস্থায় গুলিতে নিহত হন আক্তার ঢালী (৬০)। এর দেড় মাসেরও কম সময় আগে একই এলাকায় তার ছেলে জয় ঢালীকে (২৭) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে ১৫ই আগস্ট রূপসায় একই দিনে দু’জন খুন হন। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এলাকায় অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে।
হত্যাকাণ্ডের বাইরেও ছিনতাই ও প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহারের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত ৯ই অক্টোবর রাতে রূপসায় অভিযান শেষে নগরীতে ফেরার পথে কেএমপি সদর দপ্তরের কাছে কেসিসি উইমেন কলেজের সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম। তার মোবাইল ফোন ও টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ঘটনার পর জেলা পুলিশ সুপার জরুরি প্রয়োজন ছাড়া একা বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে নির্দেশনা দেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়।
কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এম শাকিলুজ্জামান এবং খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুকের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত, জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ চলছে। অপরাধী চক্রের নেটওয়ার্ক শনাক্ত, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারে কার্যকর উদ্যোগের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি এসব চক্রের উত্থান, অর্থের জোগান ও সহযোগীদের শনাক্ত করা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ থেকেই যাবে।
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) উপ-কমিশনার রেজাউর রহমান বলেন, প্রতিটি অপরাধের ঘটনায় পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। গত ১০ মাসে ৬০ জন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু জামিন পেয়ে তারা আবার বাইরে চলে আসছে। তিনি দাবি করেন, ভুক্তভোগীরা মামলা ও পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছেন না। চাঁদাবাজি বা গুলির ঘটনায় কেউ মামলা করতে চান না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দ্রুত জামিন হয়ে যাওয়ার প্রবণতা। এই দুই কারণে খুলনার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।সূ:মা:জ