সারা দেশে ৪৫৩ কিশোর গ্যাং, দিনদিন নানা অপকর্মে বাড়াচ্ছে শক্তি

অনলাইন ডেস্ক: রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ভয়াবহ আকার নিয়েছে কিশোর গ্যাং। খুনাখুনি, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, জমি দখল ও ডাকাতির মতো অপরাধে জড়াচ্ছে তারা। প্রতিটি গ্রুপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নামে-বেনামে পেজ খুলে তাদের কর্মকাণ্ড আপলোড করছে। এসব দেখে অন্য কিশোররা প্ররোচিত হচ্ছে। এতে সমাজে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। ঢাকাসহ সারা দেশে বর্তমানে ৪৫৩টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ঢাকার উত্তরায় ২০০১ সালে প্রথম কিশোর গ্যাং ‘টেন গ্যাং’য়ের উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বখাটে তরুণদের গ্রুপভিত্তিক আড্ডাবাজি থেকে এই চক্রের জন্ম। এরপর ধীরে ধীরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তা ছড়িয়ে পড়ে। এখন শুধু ঢাকা নয়, বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ে বিস্তার লাভ করেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে বর্তমানে ৪৫৩টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। রাজধানীর পর সবচেয়ে বেশি কিশোগ্যাং সদস্য সক্রিয় চট্টগ্রামে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানায় রয়েছে ১৬১ কিশোর গ্যাং। আর চট্টগ্রাম বিভাগের চটগ্রাম মহানগর এলাকাসহ ১১ জেলায় ১৩০টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। চক্রের সদস্যরা মাদক কারবার ও সেবনে জড়িত। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগের পতন হলেও অধিকাংশ কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব এখনো ছাত্রলীগের হাতেই রয়ে গেছে বলে মাঠ পর্যায়ের তথ্যে জানা গেছে। এমন অবস্থায় সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযানের পরিকল্পনা করছে পুলিশ।

অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, খেলাধুলার মাঠ বা বিনোদনের সংকট এবং রাজনৈতিক বড় ভাইদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে কিশোরগ্যাং কালচার বিস্তার লাভ করছে। একজন কিশোরের প্রথম জায়গা হচ্ছে তার পরিবার। পরিবার যখন কোনো কিশোরকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছে না, তখন তার মধ্যে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। সেই শূন্যতা পূরণে কিশোরগ্যাংয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলের নেতারা দল ভারি করার জন্য কিশোরগ্যাং সদস্যদের প্রশ্রয় দিচ্ছে।

পুলিশ বলছে, কিছু দরিদ্র শিক্ষার্থীও কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। বর্তমানের গ্যাং কালচারে বন্ধুত্বের নেটওয়ার্ক ও ক্ষমতা চর্চার প্রভাব দেখাচ্ছে। এতে গ্যাং কালচার বাড়ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গোয়েন্দা নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান জোরদার করেছে। গ্যাং সদস্যদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অস্ত্র, মাদক ও অপরাধে তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয়ভাবে সমাজের অন্য অংশীদারদের সহযোগিতায় কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে সচেতনতামূলক ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমও গুরুত্ব পাচ্ছে।

অপরাধ বিজ্ঞানি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, শুধু পুলিশি অভিযান বা শর্টকাট সমাধানে কিশোর গ্যাং পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। সমস্যার গভীরে গিয়ে পরিবার ও সমাজকে দায়িত্ব নিতে হবে। পরিবারে সুস্থ পরিবেশের অভাব, খেলাধুলার মাঠ বা বিনোদনের সংকট এবং রাজনৈতিক বড় ভাইদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে কিশোররা গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়ছে। যারাই অপরাধ করুক, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

পুলিশ জানায়, ঢাকার আটটি বিভাগের ৫০টি থানায় ১৬১ কিশোর গ্যাং চক্র রয়েছে। এর মধ্যে মিরপুরে ৩৯টি, ওয়ারিতে ২৩, রমনায় ১৫, লালবাগে ২০, গুলশানে ১২, মতিঝিলে ১৪, তেজগাঁওয়ে ২৩ এবং উত্তরা এলাকায় ১৫ কিশোর গ্যাং রয়েছে।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, মিরপুরের ‘বগা হৃদয়’ গ্রুপটি কল্যাণপুর পোড়া বস্তি এলাকা, ভাস্কর গ্রুপ মিরপুরের ওয়ালাপাড়া ও ধানক্ষেত মোড় এবং দারুস সালামের ‘এলকে ডেভিল বয়েজ’ লালকুঠির তৃতীয় কলোনি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। ‘পটেটো রুবেল’ গ্রুপের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন রাসেল। এই গ্রুপ ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি, বসুপাড়া ও খালেক সিটি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে।

এছাড়া ‘অতুল গ্যাং’ তিনতলা মসজিদ এলাকা, ‘অপু গ্রুপ’ কল্যাণপুর নতুন বাজার ও ১১ নম্বর ওয়ার্ড এলাকা, ‘রকি গ্রুপ’ ১২ নম্বর সেকশনের বি-ব্লক এবং বিবাহবাড়ী কমিউনিটি সেন্টার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। পিন্টু ও কাল্লু গ্রুপ ১১ নম্বর সেকশনের ব্লক- বি এর ঈদগাহ্ মাঠের পশ্চিম পাশের এলাকা, ভাই-ভাই গ্রুপ ডি-ব্লকের আরবান শিশুপার্ক এলাকা এবং রোমান্টিক গ্রুপ কুর্মিটোলা ক্যাম্প ও তার আশপাশের এলাকা, সোহেল গ্রুপ চলন্তিকার আশপাশের এলাকা, ইমন গ্রুপ রূপনগর আবাসিক, জুয়েল গ্রুপ গুদারাঘাট ও কাজীফরীবাজার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

গুলশানের ডি-নাঈম গ্রুপ বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ‘মাইরা ভইরা দে’ গ্রুপ ছোলমাঈদ নিয়ন্ত্রণ করে। আর কানা জসিম গ্রুপের সদস্য ৪০-এর অধিক। গ্রুপটি ফার্মগেট, তেজকুনিপাড়া, নাখালপাড়া ও তেজগাঁও রেলওয়ে কলোনি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। শাকিল গ্রুপ তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার সিদ্দিক মাস্টারেরর ঢাল ও ইয়াং স্টার স্পোর্টিং ক্লাবের আশপাশের এলাকায় সক্রিয়।

পুলিশ সূত্র জানায়, ঢাকার সবচেয়ে অপরাধপ্রবণ এলাকা মোহাম্মদপুর। এই এলাকায় ‘ঘুটা দে গ্রুপ’ সক্রিয়। চক্রটি চন্দ্রিমা হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, একতা হাউজিং ও বেড়িবাঁধসহ আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। আদাবরের শেখেরটেকের মনসুরাবাদ এলাকার কিশোর গ্যাং ‘দ্যা কিং অব গাইরালা’ গ্রুপটি সক্রিয় আছে। শাহবাগের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘আলফা ওয়ান’ নামে একটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। হাজারীবাগের মিতালী রোড ও তল্লাবাগ এলাকায় ‘লাভলেন গ্রুপ’টির উৎপাতে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী।

জানা গেছে, ডেমরার লালশাহ্ মাজার এলাকায় স্বপ্নিল পৃথিবী, লালবাগ কেল্লা এলাকায় ‘টিকটক গ্রুপ’, উত্তরা পশ্চিম থানাধীন ১২ ও ১৩ নম্বর সেক্টর এলাকা নাইনস্টার গ্রুপ এবং উত্তরা পূর্ব থানার ৪ নম্বর সেক্টরে ‘এইচবিটি হিটার বয়েজ’ গ্রুপ তাদের কর্মকাণ্ড ফেসবুকে তুলে ধরছে।

অনুসন্ধান ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরসহ বিভাগের ১১ জেলায় ১৩০টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। শুধু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ৭৮টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। পতেঙ্গা, হালিশহর, খুলশী, চকবাজার ও বাকলিয়া এলাকায় চক্রটি সক্রিয় রয়েছে। এছাড়াও চট্টগ্রাম জেলায় পাঁচটি, কুমিল্লায় ছয়টি, নোয়াখালীতে পাঁচটি, কক্সবাজারে আটটি, নোয়াখালীতে চারটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাঁচটি, চাঁদপুরে চারটি, লক্ষ্মীপুরে তিনটি, ফেনীতে তিনটি এবং পার্বত্য তিন জেলায় আটটি কিশোর গ্যাং সক্রিয়।

ঢাকা বিভাগের ঢাকা জেলায় ১২, গাজীপুরে ১৩, নারায়ণগঞ্জে ১৩, নরসিংদীতে পাঁচ, টাঙ্গাইলে তিন, কিশোরগঞ্জে তিন, মানিকগঞ্জে তিন, মুন্সীগঞ্জে তিন, রাজবাড়ীতে তিন, ফরিদপুরে চার, মাদারীপুরে চার, গোপালগঞ্জে তিন ও শরীয়তপুরে তিনটিসহ ৭১টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়।

এছাড়াও রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় ১৭টি, খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় ১৫, সিলেট বিভাগের চার জেলায় ১২, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ২০, ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় ৯ এবং রংপুর বিভাগের আট জেলায় ১৮টি কিশোর গ্যাং চক্র সক্রিয় আছে।

পুলিশ জানায়, কিশোর গ্যাং সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে পুলিশ। যেসব এলাকায় নতুন নতুন কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে, গোয়েন্দাদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য এবং তাদের নেপথ্যে থাকা গডফাদার বা রাজনৈতিক আশ্রয়দাতাদের গ্রেপ্তার ও আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে পুলিশ। পাশাপাশি টহল জোরদার এবং নিয়মিত বিশেষ অভিযান চালিয়ে চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

দেশের প্রত্যেকটি এলাকায় পুলিশের টহল টিমকে পাড়া-মহল্লা বিশেষ করে কিশোরদের আড্ডার স্থানগুলোতে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার। পাশাপাশি গ্যাং কালচার প্রতিরোধে বিট পুলিশিং কার্যক্রমকে কাজে লাগানো হচ্ছে। উঠান বৈঠকের মাধ্যমে থানা পুলিশের বিটে দায়িত্ব থাকা সদস্যরা অভিভাবকদের নিয়ে সভা করছেন।সূ:আ:দেশ

মন্তব্য করুন