অনলাইন ডেস্ক: ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সউদী আরবের সংঘাত তীব্র হওয়ার মধ্যেই সক্রিয় হলো সউদী আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোট। সউদী আরবের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখ-তার ওপর যেকোনো হামলা বা হুমকি মোকাবিলায় জোটের যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তিন দেশ।
এর আওতায় সউদী আরবে সম্মত সামরিক বাহিনী ও সামরিক সক্ষমতা দ্রুত মোতায়েনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সোমবার (৫ অক্টোবর) সউদী রাজধানী রিয়াদে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের কৌশলগত-রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে সউদী আরবের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ইয়েমেনের হুথিদের হামলা এবং মক্কা-মদিনাসহ সউদী শহর ও বেসামরিক-অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলার হুমকি নিয়ে আলোচনা করা হয়। যৌথ বিবৃতিতে হামলার জন্য সরাসরি হুথিদের নাম না নেওয়া হলেও তিন দেশ সউদী আরবের ওপর যেকোনো হামলা বা হুমকির কঠোর নিন্দা জানিয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তিন দেশ ‘সম্মিলিত প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ’ নেবে। একই সঙ্গে সউদী আরবে প্রয়োজনীয় সামরিক বাহিনী ও সক্ষমতা সরবরাহ এবং তা দ্রুত মোতায়েন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব পদক্ষেপ অনুমোদিত ব্যবস্থাপনা ও তিন দেশের জাতীয় আইন অনুযায়ী বাস্তবায়িত হবে। তবে সউদী আরবে কত সেনা পাঠানো হবে কিংবা তারা ঠিক কী ধরনের সামরিক দায়িত্ব পালন করবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি। মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আগস্টে স্বাক্ষরিত তিন দেশের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রথমবারের মতো বড় ধরনের বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নিল। গত ৭ আগস্ট মক্কায় চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সউদী ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। চুক্তির মূল লক্ষ্যÑতিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সম্মিলিতভাবে তা মোকাবিলা করা।
এদিকে, গতকাল সউদী আরবের দুটি বিমানবন্দরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিরা। এতে বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার পাশাপাশি বিমানবন্দর দুটির কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জবাবে ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে হুথিদের অস্ত্রাগার ও সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যাপক পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছে সউদী নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। সউদী সামরিক সুত্রে জানা গেছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় জাজান ও নাজরান বমানবন্দরে এই হামলা চালানো হয়। হামলার পরপরই সতর্ক অবস্থা জারি করা হয় এবং আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এদিকে, সউদী আরবে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ইয়েমেনে হুথিদের শক্তঘাঁটি সানা-সহ একাধিক এলাকায় পাল্টা বিমান হামলা চালায় সামরিক জোট। হুথিদের ভারী অস্ত্র মজুদ রাখার স্থান ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে এই হামলাগুলো চালানো হয়েছে বলে সামরিক জোটের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
মোখা বন্দর পুনর্দখলের দাবি ইয়েমেনি বাহিনীর : হুথিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা পুনর্দখলের দাবি করেছে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনী। একই সঙ্গে বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পুনর্দখলের অভিযানও জোরদার করা হয়েছে।
সোমবার সউদী আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী বাব আল-মান্দাব প্রণালির উপকূল ধরে অগ্রসর হয়ে মোখার দিকে পৌঁছায়। পরে ইয়েমেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মোখা শহর সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানায়। এর আগে সরকারি বাহিনী পশ্চিম তাইজ প্রদেশের ধুবাব জেলা এবং বাব আল-মান্দাবের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পুনর্দখলের দাবি করে। ইয়েমেনের সরকারি বার্তা সংস্থা সাবার বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, হোমল্যান্ড শিল্ড ফোর্সেস ও জায়ান্টস ব্রিগেডের যৌথ অভিযানে এসব এলাকায় হুথিদের সরবরাহ পথ ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সরকারি বাহিনী আরও জানিয়েছে, মোখার আশপাশের কয়েকটি ফ্রন্টে তীব্র লড়াই হয়েছে। এতে হুথিদের বেশ কয়েকজন যোদ্ধা নিহত ও আহত এবং কয়েকজন আটক হয়েছেন বলে সামরিক সূত্রের দাবি। তবে হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। একই সময়ে ইয়েমেনের রাজধানী সানা পুনর্দখলের লক্ষ্যে একটি ‘কৌশলগত অভিযান’ শুরুর কথাও জানিয়েছে সরকারি বাহিনী। ২০১৪ সাল থেকে রাজধানী সানা ও দেশটির জনবহুল উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
হামলা হলে আরও উন্নত মারণাস্ত্র দিয়ে জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের : যুক্তরাষ্ট্র বা তার সহযোগী ইসরায়েলের যেকোনো ধরনের ভুল পদক্ষেপে কঠোর ও ‘ধ্বংসাত্মক’ জবাব দেওয়ার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটি জানিয়েছে, যেকোনো ধরণের আগ্রাসন প্রতিরোধে তাদের সশস্ত্র বাহিনী এখন সর্বাত্মক প্রস্তুত রয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় এই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান।
তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি প্রস্তুত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর (ইসরায়েল) যেকোনো ভুল হিসাব-নিকাশের অপেক্ষায় ট্রিগারে আঙুল দিয়ে বসে আছে আমাদের বাহিনী।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘যেকোনো ভুল পদক্ষেপের জবাবে তারা যে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে, তা অতীতে তাদের দেখা যেকোনো অভিজ্ঞতার চেয়ে বহুগুণ বেশি কঠোর হবে।’ এদিকে, গতকাল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালাই-নিক বলেন, ‘শত্রুপক্ষের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক আগ্রাসনের মতো যেকোনো পদক্ষেপের মুখে তাদের আবারও চরম পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হবে। যেকোনো ভুল হিসাব-নিকাশের জবাব দেওয়া হবে আরও উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র ও বিধ্বংসী আক্রমণের মাধ্যমে।
কূটনীতিতে ফেরার আহ্বান জাতিসংঘ মহাসচিবের : ইসলামাবাদে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাকদারের সাথে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত অবিলম্বে বন্ধ করে কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নৌ চলাচলের অধিকার পুনর্বহালের ওপর জোর দেন। সংবাদ সম্মেলনে গুতেরেস মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শান্তির প্রশ্নে ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের এ অধিকার স্বীকৃত না হওয়া পর্যন্ত অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমন এবং মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন জাতিসংঘ প্রধান।
ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের নিচে নামল তেলের দাম : বিশ্ববাজারে কিছুটা স্বস্তি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলে ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সরবরাহ বিঘিœত হওয়ার শঙ্কা থাকলেও, তেল রপ্তানির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বাজারে পর্যালোচনার প্রেক্ষাপটে এ দরপতন ঘটেছে। এশীয় শেয়ারবাজারে লেনদেনের সময় ব্র্যান্ড ক্রুড তেলের দাম ০.৭৫ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৯৯.৫৭ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ১.২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ব্যারেল প্রতি ৮৮.৩৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে অব্যাহত লড়াই সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন, যার প্রভাব পড়েছে তেলের সার্বিক দামে। সূত্র : রয়টার্স, এপি, আলজাজিরা, ডন, তাসনিম।ই