-অধ্যাপক শাব্বির আহমদ
==============================
ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের জড়িয়ে পড়াকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মহল একটি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক ও ভূরাজনৈতিক "চোরাবালি" (Quagmire) হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে রিয়াদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল, স্বল্প সময়ের মধ্যে হুতি বিদ্রোহীদের দমন করে ইয়েমেনের ক্ষমতাচ্যুত সরকারকে পুনর্বহাল করা। তবে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ বর্তমানে সৌদি আরবের জন্য চরম এক সংকট ও জটিল ফাঁদে পরিণত হয়েছে, যা থেকে সহজে বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হুতি-সৌদি সমর্থিত বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর আপাত শান্ত থাকলেও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাযা শেষে তেহরান থেকে হুতি প্রতিনিধিদের বহনকারী একটি ইরানি বিমান ইয়েমেনে ফেরার পথে গত ১৩ জুলাই সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে লক্ষ্য করে সৌদি যুদ্ধ বিমান হামলা চালালে হুতিরা এ হামলাকে ২০২২ সালের যুদ্ধ বিরতির চূড়ান্ত লঙ্ঘন হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী, লোহিত সাগর এবং সৌদি আরবের অভ্যন্তরে ব্যাপক আক্রমণ শুরু করে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ থেকে নতুন সামরিক 'ইয়েমেন্স ডন’ বা ‘ইয়েমেনের ভোর’ নামে সর্বাত্মক অভিযানে নামে। শুরুতেই সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, হোদেইদা ও আমরাল অঞ্চলসহ বিভিন্ন হুতি লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক বিমান ও স্থল হামলা চালিয়ে সাফল্য লাভ করলেও হুতিদের পাল্টা হামলায় সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনীর অগ্রযাত্রা ব্যাপক প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। এবারের যুদ্ধে হুতিরা যুদ্ধকে শুধু ইয়েমেনের সীমানায় আটকে রাখেনি, বরং তা সরাসরি সৌদি আরবের ভেতরে নিয়ে গেছে। হুতি বাহিনী সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু যেমন— রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, আবহা, জাজান প্রদেশে এবং আরামকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব হামলায় ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটছে এবং রিয়াদের স্কুলগুলোতে সাময়িকভাবে অনলাইন পাঠদান চালু করতে হচ্ছে। সৌদি আরব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে হুতিদের ওপর সরাসরি সামরিক হামলার অনুরোধ জানালেও আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। উল্টো যুক্তরাষ্ট্র ওমানে হুতিদের সঙ্গে বৈঠক করে লোহিত সাগরে নিজেদের জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যম। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি সিএনএনকে বলেন, ‘সৌদি সামরিক বাহিনী কখনোই একা বড় যুদ্ধ লড়ার মতো করে গড়ে ওঠেনি। আগে এমন সংকটে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় মার্কিন সহায়তা পাওয়া যেত, কিন্তু এখন সব কিছুই নির্ভর করে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত খেয়ালখুশির ওপর, যা সৌদি আরবকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মিশরের সুয়েজ় খালের ‘গ্রেট বিটার হ্রদে’ নোঙর ফেলে মার্কিন রণতরী ইউএসএস কুইন্সি। ওই যুদ্ধজাহাজে বসে আমেরিকার সঙ্গে ৬০ বছরের জন্য একটি গোপন চুক্তিতে সই করেছিলেন সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশা আবদুল আজিজ ইবনে সউদ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে তখন ফ্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট। সমঝোতার তারিখটা ছিল ১৯৪৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। সৌদি-মার্কিন কুইন্সি চুক্তির মূল ভিত্তি ছিল, নিরাপত্তার বিনিময়ে তেল। এই সমঝোতা মেনে বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রকে সুলভ মূল্যে এবং নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে জ্বালানি সরবরাহ করে আসছে রিয়াদ।

বিনিময়ে বহিঃশত্রুর হাত থেকে আরব রাষ্ট্রটির রাজপরিবারকে রক্ষার ব্যাপারে কোনও কার্পণ্য দেখায়নি আমেরিকা। ২০০৫ সালে কুইন্সি চুক্তিকে আরও ৬০ বছরের জন্য পুনর্নবীকরণ করেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। এই সময়সীমার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একাধিক প্রতিরক্ষা সমঝোতায় আবদ্ধ হয় রিয়াদ। যার মধ্যে ১৯৫১ সালের ‘পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহায়তা’ সমঝোতাটি গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া, ২০১৭ ও ২০২৫ সালে আমেরিকার সঙ্গে ১১,০০০ কোটি এবং ১৪,২০০ কোটির অস্ত্র চুক্তিতেও সই করেন এমবিএস। বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে সৌদিকে বাঁচাতে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রটিতে বিশাল ফৌজ ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন রেখেছে আমেরিকা। যদিও রিয়াদের অভিযোগ, হামলার সময় শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনকে মাঝ আকাশে ধ্বংস করার তেমন গরজ দেখাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র। উল্টে, হুথিদের ব্যাপারে ওয়াশিংটনের মনোভাব যথেষ্টই ঢিলেঢালা। যার জেরে ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের হাতে যখন তখন মার খেতে হচ্ছে রিয়াদকে। বর্তমানে সৌদিতে দু’টি অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা- প্যাট্রিয়ট ও থাড মোতায়েন রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু হুতিদের হামলা আটকাতে ব্যর্থ হচ্ছে এই দুই হাতিয়ার। সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে রিয়াদের মাথার উপর থেকে ধীরে ধীরে হাত সরাচ্ছে আমেরিকা। যার চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে এমবিএসকে। হুতিদের ধ্বংস করতে নেতানিয়াহু আগ্রহ দেখালেও ইসরায়েলের সাহায্য নেওয়া সৌদির কাছে ‘খাল কেটে কুমির আনা’র সামিল। ইসরায়েলের সাহায্য নিলে আরব রাষ্ট্রটির অভ্যন্তরে জ্বলে উঠতে পারে বিদ্রোহের আগুন। আর তাই আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সাহায্যের জন্য পথ চেয়ে বসে থাকতে হচ্ছে এমবিএসকে।
এদিকে ত্রি- দেশীয় "মক্কা জোট" (Mecca Joint Defence Pact) মূলত একটি আত্মরক্ষামূলক ও কৌশলগত সীমারেখা ভিত্তিক চুক্তি হওয়ার কারণে সরাসরি হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের ভেতরে গিয়ে অভিযান চালাচ্ছে না। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মূল ভিত্তি হলো ন্যাটোর মতো "যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি" (Collective Defence)। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, মক্কা জোটের সেনারা ইয়েমেনের সীমান্ত অতিক্রম করে হুতিদের ওপর কোনো আক্রমণাত্মক অভিযান চালাবে না, তবে সৌদি আরবের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তুরস্কও একই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, হুতিদের প্রধান মদদদাতা হলো ইরান। পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো জোটভুক্ত দেশগুলো তেহরানের সাথে তাদের দ্বিপাক্ষিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া-সুন্নি বা আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধে সরাসরি জড়াতে আগ্রহী নয়। তাই তারা ইয়েমেনের ভেতরে পা না বাড়িয়ে কেবল সৌদি আরবের সুরক্ষায় নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় পাকিস্তান ও তুরস্ক ইতিমধ্যেই "র্যাপিড ডেপ্লয়মেন্ট" বা দ্রুত সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ, জোটটি ইয়েমেনের অভ্যন্তরে নিষ্ক্রিয় হলেও সৌদি আরবের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড রক্ষায় বর্তমানে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদরর মতে, ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ভুল কৌশলগত ও সামরিক হিসাব-নিকাশের কারণে ইয়েমেন যুদ্ধের চোরাবালিতে আটকে গেছে সৌদি আরব। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মূল লক্ষ্য হলো "ভিশন ২০৩০"-এর আওতায় সৌদি আরবকে তেল-নির্ভরতা থেকে বের করে একটি গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট, মেগা ট্যুরিজম ও ক্রীড়া হাব হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু ইয়েমেন থেকে অনবরত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের মাঝে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে, যা এই বিশাল অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনাকে গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনের এই সংঘাত সৌদি আরবের জন্য এমন এক চোরাবালি, যেখানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া মানে বিপুল অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতি, আর হুতিদের মেনে নিয়ে পিছু হটা মানে নিজের সীমান্তে একটি চরম বৈরী ও শক্তিশালী গোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ইয়েমেনের সংঘাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ওয়াশিংটন ও তেহরানের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সৌদি আরবকে চাপে রাখতে হুতিদের সমর্থন দেওয়ার প্রণোদনা ইরানের থাকবে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে আলাদা কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করতে পারে, অথবা হুতি নেতৃত্বকে দুর্বল করতে সামরিক হামলা আরও জোরদার করতে পারে। তবে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত র্যাটনির মতে, এই দুই পথের কোনোটিই নিকট ভবিষ্যতে ইয়েমেন সংঘাতের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করবে না। সৌদি আরবকে তাই অনিশ্চিত ও জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই এগোতে হবে।
লেখক পরিচিতি:
কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।