--অধ্যাপক শাব্বির আহমদ।
======================================
লণ্ডন থেকে আসা গুজরাটি জমিদারপুত্র ব্যারিস্টার মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন মুসলমানদের আলাদা দেশ পাকিস্তানের আইডিয়াতে সাবস্ক্রাইব করলেন, তখন জিন্নাহ নিজেও জানতেন না যে আসলে তিনি সফল হবেন কিনা। প্রথম প্রথম তার পক্ষে আসলে তেমন কেউ ছিল না। ইন্ডিয়ান অনেক মুসলমানরাও চান নাই যে পাকিস্তান নামে আলাদা কোনো দেশ হোক। অনেকের দৃষ্টিতে সেটা ছিল একটা অসম্ভব ব্যাপার। কারণ, ইন্ডিয়ান মুসলমানদের মধ্যে কোনো ঐক্য ছিলনা। যা ছিল, তা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা। কিন্তু জিন্নাহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মুসলমানকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। জিন্নাহর পক্ষে প্রথম শ্রেণীর কোনো মুসলমান নেতারাও ছিল না। মাওলানা সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী, দেওবন্দের আলেমদের বড় একটি অংশ জিন্নাহর পক্ষে ছিলেন না। মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানি গ্রুপ সরাসরি অখন্ড ভারতের পক্ষে ছিলেন। পক্ষান্তরে মাওলানা আশরাফ আলী থানবি গ্রুপ মুসলিমলীগের সমর্থক ছিলেন। মাওলানা মূফতি শফি ও মাওলানা শাব্বির আহমদ উসমানিরাও প্রকাশ্যে পাকিস্তান পক্ষে ছিলেন। জিন্নাহ বড় সাফল্য ছিল তিনি তৃণমূল পর্যায়ের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। শেখ মুজিবও জিন্নাহর পক্ষে পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিয়ে রাজনীতি করার সবিস্তার বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে। নিম্নবর্ণের দলিত হিন্দুরা, যাদেরকে তফশীলি সম্প্রদায় বলা হতো, তারাও পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে ছিল। তফশীলি হিন্দুদের নেতা ব্যারিস্টার যোগেন্দ্রনাথ নাথ মণ্ডল জিন্নাহর পাকিস্তান আন্দোলনে সরাসরি যোগই শুধু দেন নাই, বিরাট ভূমিকাও রাখেন। জিন্নাহ মুসলমানদের জন্য আলাদা দেশ চেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেটা শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য চান নাই। জিন্নাহ চেয়েছিলেন হিন্দুত্ববাদের হাত থেকে মুক্ত এমন একটা দেশ, যে দেশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সকল ধর্মের মানুষরা সমমর্যাদায় বসবাস করবে। যেখানে কারো উপরে ধর্মীয় কারণে কোনো আক্রমণ হবে না।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত একটা ফেডারেল স্টেট করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল: মোট প্রদেশ হবে ৫ টি, এরমধ্যে ৩ টি থাকবে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ আর ২ টিতে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ। এতে একটা অরগানিক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় থাকবে। শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, অর্থ মন্ত্রণালয় থাকবে কেন্দ্রের অধীনে, বাকী সব কিছু থাকবে প্রাদেশিক সরকারের অধীনে। দেশের নাম হবে ইউনাইটেড স্টেটস অব ইন্ডিয়া বা ভারত যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু কংগ্রেস এই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে। উল্টো জিন্নাহকে প্রধানমন্ত্রী বানানোর প্রস্তাব দিয়ে বলা হয়, তিনি হবেন পৃথিবীর বৃহত্তম গনতান্ত্রিক দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সব রকম প্রচেষ্টা চালিয়েও কংগ্রেসকে ফেডারেল স্টেটের ফজিলত সম্পর্কে বোঝাতে ব্যর্থ হন। তিনি বুঝতে পারেন, হিন্দুত্ববাদীরা চায় 'অখন্ড ভারত' তত্ত্বের আলোকে ইংরেজদের রেখে যাওয়া সাম্রাজ্যের নতুন সম্রাট হতে। এই অবস্থাতে জিন্নাহ কংগ্রেস ত্যাগ করে যোগ দেন মুসলিম লীগে এবং এরপরই আল্লামা ইকবালের ঐতিহাসিক দ্বি-জাতিতত্ত্ব গ্রহন করেন। দ্বি জাতিতত্বের ভিত্তিতে জিন্নাহ প্রথমে চেয়েছিলেন ভারতে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। কিন্তু গান্ধী, নেহেরু, সর্দার রাজবল্লব প্যাটেলরা স্বায়ত্তশাসনও দিতে রাজী হননি। তারা পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্য রাজী হয়েছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, দূর্বল রাষ্ট্র পাকিস্তান খুব বেশিদিন ঠিকতে পারবে না। দুইদিন পর ভারত দখল করে নেবে। জিন্নাহর মৃত্যুর ঠিক দুইদিন পর ওরা হায়দারাবাদ আক্রমণ করে দখল করে নিয়েছিল।
জিন্নাহর নেতৃত্বে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীন হলো। জিন্নাহ যা চেয়েছিলেন, তার অর্ধেকও পান নাই। কিন্তু মুসলমানদের জন্য নিরাপদ একটা সীমানা নির্ধারণ করতে পেরেছিলেন। মুসলমানদের জন্য আলাদা ভূমি পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন আল্লামা ইকবাল। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। জিন্নাহকে সহায়তা করেন বাংলার সূর্যসন্তান শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন সোহরাওয়ার্দীরা। তাদের কারণে পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশ পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়ে ভারতের অংশ হওয়া থেকে বেঁচে যায়। জিন্নাহ জানতেন, তিনি বেশীদিন বাঁচবেন না। জিন্নাহ আশঙ্কা করেছিলেন, এটা জানলে বৃটিশদের বলে কংগ্রেস পার্টিশান প্ল্যান পিছিয়ে দেবে। ফলে আর কখনো মুসলমানদের আলাদা দেশ পাওয়া হবে না। জিন্নাহর আশঙ্কা যে সত্য ছিল, সেটা লর্ড মাউন্টব্যাটেন নিজেই তার লেখাতে বলেছিলেন: জিন্নাহ বেশিদিন বাঁচবেন না জানলে তিনি দেশভাগ পিছিয়ে দিতেন। ফলে আর কখনো দেশভাগ হতো না। কারণ জিন্নাহর মত একরোখা এবং সবাইকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারবে, এরকম আর কোন ক্যারেশম্যাটিক লিডার মুসলমানদের মধ্যে ছিল না। জিন্নাহ তড়িঘড়ি করে যা পেয়েছেন, সেটা নিয়েই পাকিস্তান গড়েন। বোন ফাতেমা জিন্নাহকে নিয়ে জন্মভূমি ছেড়ে নতুন দেশ পাকিস্তানে চলে যান। জটিল রোগে আক্রান্ত জিন্নাহর মৃত্যু যে সময়ের ব্যাপার মাত্র তা শুধুমাত্র তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং বোন ফাতেমা জিন্নাহ ছাড়া আর কেউ জানতেন না। ঠিকমত চিকিৎসাও নিতে পারেন নাই, যদি খবর ফাঁস হয়ে যায় সে ভয়ে। কারন এই খবর প্রকাশ পেলে মুসলিম লীগ দুর্বল হয়ে যেত এবং কংগ্রেসও পাকিস্তানের দাবি মেনে নিতো না। মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহর পরে মুসলিম লীগে এমন কোন নেতৃত্ব ছিল না যে দুই ফ্রন্টে লড়তে পারবে। এই ভয়াবহ অসুস্থতা নিয়ে তিনি রাওয়ালপিন্ডি থেকে সিলেট, পুরো উপমহাদেশ চষে বেড়িয়েছেন, একত্রিত করেন হিন্দুস্তানি মুসলমানদের এবং আদায় করেন পাকিস্তানের দাবি। বিবিসি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য তিলক দেভেশরক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যদি গান্ধী, নেহেরু বা সর্দার প্যাটেলদের কাছে জিন্নাহর অসুস্থতার খবর পৌঁছাত, ওরাও হয়তো নিজেদের নীতি বদলে ফেলে বিভাজনের জন্য আরও বেশী সময় চাইতেন। এককথায়, পাকিস্তান আন্দোলন আর পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা একজন মাত্র ব্যক্তির ওপরেই নির্ভরশীল ছিল- তিনি হলেন মি. জিন্নাহ। লিয়াকত আলী খান আর মুসলিম লীগের অন্য নেতাদের সেই ক্ষমতাই ছিল না যে, পাকিস্তানের দাবী নিয়ে এগিয়ে যাবেন। অন্নদা শংকর রায় এই সম্পর্কে বলেছিলেন, গান্ধী না থাকলেও ভারত একদিন না একদিন স্বাধীন হতো। কিন্তু জিন্নাহ না থাকলে স্বাধীন পাকিস্তান কি আদৌ সম্ভব হতো? ভারতকে স্বাধীন করার দাবীদার আরো একজন কি দু'জনের নাম শোনা যায়, কিন্তু পাকিস্তানকে স্বাধীন করার দাবীদার আর একজনও নেই। সুতরাং এই প্রসঙ্গে গত ০৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনের এনআরসি সেন্টারে জিন্নাহর ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, কবি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খানের দেওয়া বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছাড়া পাকিস্তান হতো না এবং পাকিস্তান না হলে আমাদের এ জাতি-রাষ্ট্র বাংলাদেশ হওয়া এখনো কল্পনাই হয়ে থাকতো। জনাব মারুফ কামাল খান বলেন, আমরা এ উপমহাদেশের দীর্ঘ ইতিহাসের এক বিরাট অংশের উত্তরাধিকার। আমরা কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নই। হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা ইতিহাস, বিচ্ছিন্ন কোনো জনপদ বা জাতি গোষ্ঠীও নই আমরা। আমাদের পূর্ব পুরুষরা একদিন জিন্নাহর নেতৃত্বে আন্দোলন করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পত্তন করেছিল। সে সময় তারাই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ভালোবেসে কায়েদে আযম বা মহান নেতা উপাধীতে ভূষিত করেছিল। বাংলাদেশের খ্যাতিমান এ সিনিয়র সাংবাদিক আরও বলেন, উপমহাদেশের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল চরিত্র মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তার সম্পর্কে বাঙাল মুল্লুকে গত কয়েক বছর ধরে প্রচলিত বয়ান নতুন করে ঝালিয়ে দেখার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। জিন্নাহর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক তাদের বিবরণীতে জিন্নাহর বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ বা অপপ্রচার উত্থাপন করেন, যেগুলোকে অনেক গবেষক ও ঐতিহাসিক যৌক্তিক মানদন্ডে বিচার-বিশ্লেষণ করে খণ্ডন করেছেন। তাঁর চম্বুক অংশগুলো তুলে ধরা হলোঃ
★ জিন্নাহর বিরুদ্ধে বাঙালিদের প্রধান অভিযোগ বা অপপ্রচার তিনি উর্দুকে বাঙালিদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন।
জবাবঃ বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচিতি বই পড়লে এমন ইতিহাস তো আওড়াবেই। জিন্নাহর পুরো ভাষণটা শুনলে বুঝবেন যে কিভাবে তার ১০ মিনিটের বক্তব্য থেকে এক লাইন তুলে নিয়ে ফ্রেমিং করা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, প্রদেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্ধারণ করবেন তাদের দাপ্তরিক ভাষা। তিনি প্রাদেশিক স্তরে বাংলার অধিকার কেড়ে নেওয়ার কথা বলেননি। জিন্নাহর যুক্তি ছিল, পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের (সিন্ধি, বেলুচ, পাঞ্জাবি, পশতু) মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য একটি সাধারণ রাষ্ট্রভাষা (Lingua Franca) প্রয়োজন এবং সেটি হওয়া উচিত উর্দু। তিনি বাঙালিদের মাতৃভাষা পরিবর্তন করতে বলেননি, বরং একটি কেন্দ্রীয় সংযোগকারী ভাষার কথা বলেছিলেন। তাদের মতে, ভাষা প্রশ্নে জিন্নাহর খন্ডিত উক্তি ছাড়াও জিন্নাহর আদি ও আসল পাপ মূলতঃ 'অখণ্ড ভারততত্ত্ব' ও ব্রাহ্মণ্যবাদের ওপর রাজনৈতিক আঘাত। রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারার দুঃখ, গ্লানি, বেদনা সব যুক্ত হয়েছিল তখন জিন্নাহ ঘৃণায়। ভাষা প্রশ্নে জিন্নাহর বক্তব্যের পর এদেশীয় অখণ্ড ভারত তত্ত্বের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক বরকন্দাজ ইতিহাসবিদরা জিন্নাহ ঘৃণায় সর্বস্ব বিনিয়োগ করছে এই পর্যন্ত। জিন্নাহ নিজেও ভালো মতো উর্দু পারত না। তিনি ছিলেন গুজরাটি। তার প্রধানমন্ত্রী লেয়াকত আলী খান ছিল পাঞ্জাবি। তার শিক্ষা মন্ত্রী ফজলুল হক ( সালমান এফ রহমানের বাবা) ছিলেন বাঙ্গালি, আদি ঢাকাইয়া।
★ জিন্নাহ বিরুদ্ধে আরেকটা অপপ্রচার ছিল, জিন্নাহ কলকাতাকে ছেড়ে দিয়ে লাহোরকে পাকিস্তানের ভাগে নিয়ে আসেন।
জবাবঃ কলকাতার মোট জনসংখ্যার ৭০% ছিল হিন্দু। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতাতে যে ১৭ জন মেয়র হয়েছিল, তাদের মধ্যে ৪ জন ছিল মাত্র মুসলিম। হিন্দু ভোট তিন ভাগে ভাগ হতঃ কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা ( বিজেপি ) ও বাম। ভাগাভাগি হয়ে যাবার কারণে মাঝে মধ্যে মুসলিমরা জিতে যেত। কিন্তু ওটা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ শহর ছিল। অপর দিকে ৭০% মুসলিম অধ্যুষিত লাহোর সেই মোহাম্মদ বিন কাশিমের সময় থেকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই ভারত ভাগের নিয়ম অনুসারে কলকাতা ভারতেই পড়ার কথা ছিল। তেমনি লাহোর পাকিস্তানেই আসত। এরপরও জিন্নাহ কলকাতাকে পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে আনার জন্য লর্ড ক্লাইভের কাছে অনেক দেন দরবার করেন। জিন্নাহ মনে করতেন, কলকাতা ছাড়া পূর্ববঙ্গ অর্থহীন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের প্রাক্কালে যখন অখণ্ড স্বাধীন বাংলার প্রস্তাব (শরৎচন্দ্র বসু ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগে) দেওয়া হয়, তখন জিন্নাহ তাতে সমর্থন দিয়েছিলেন। তার মূল কারণ ছিল, কলকাতা ছিল তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ড ও রাজধানী। জিন্নাহ অনুধাবন করেছিলেন যে, কলকাতাকে বাদ দিলে পূর্ব অংশের কৃষিপ্রধান অঞ্চলটি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও পঙ্গু হয়ে পড়বে। তিনি মনে করতেন, কলকাতা ছাড়া বাংলা টিকতে পারে না। তাই বাংলার বিভক্তি ঠেকিয়ে একে পাকিস্তানভুক্ত করার বা স্বাধীন রাখার পক্ষে তিনি জোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত র্যাডক্লিফ রোয়েদাদ ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় কলকাতা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তান আলাদা ভূখণ্ড হিসেবে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জিন্নাহ চেয়েছিলেন যেন পাঞ্জাব ও বাংলার পুরো অংশ পাকিস্তানে আসে। কিন্ত নেহেরু, সর্দার রাজবল্লব প্যাটেল, শ্যামা প্রসাদরা এই দুই প্রদেশকে ভাগ করে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে ভারতে যুক্ত করে নিতে সমর্থ হন।
★ জিন্নাহর বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ ছিল, জিন্নাহর পূর্ব বাংলা নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা ছিল না।
জবাবঃ যারা এমন প্রশ্ন আওড়ান তাদের মনে কি কখনো এই প্রশ্ন জাগে না যে, ৯৯% অমুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ পার্বত্য চট্টগ্রাম কিভাবে পাকিস্তানের অংশ হল ? দেশ ভাগের নিয়ম অনুসারে তো এই তিন জেলা ভারতের ভাগে পড়ার কথা ছিল। উপমহাদেশ বিভক্তির প্রাক্কালে রাঙামাটির চাকমা রাজ প্রাসাদে ভারতের পতাকাও উড়েছিল কয়েকদিন। কিন্তু এই তিন জেলা যদি ভারতের ভাগে পড়তো তবে চট্টগ্রাম বন্দর অরক্ষিত হয়ে যেত। তাই জিন্নাহ পাঞ্জাবের একটা গুরুত্বপূর্ণ জেলা ফিরোজপুরকে ভারতকে দিয়ে ভারত থেকে তিন পার্বত্য জেলাকে নিয়ে নেন। এই যে খাগড়াছড়ির সাজেক ভ্যালিতে ঘুরতে যান, সুন্দর ছবি তুলেন, সেই সময়ে পাঞ্জাবের ফিরোজপুরের মুসলমানদের কথা একটু স্মরণ রাখিয়েন। পাঞ্জাবি মুসলিমরা তাদের নিজেদের জেলা ছেড়ে দিয়েছিল আপনাদের এই তিন জেলার জন্য।
★ জিন্নাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, তাঁর খামখেয়ালির কারনে নাকি পূর্ব বাংলা অনেকখানি বঞ্চিত হয়েছে; মুসলিম অধ্যুষিত হয়েও মুর্শিদাবাদ, মালদাহ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
জবাবঃ ভারত ভাগে বাংলা ও পাঞ্জাব উভয় বঞ্ছিত হয়েছে। পাঞ্জাবের অর্ধেক ভারত কেটে নিয়েছে। জিন্নাহ চেয়েছিল যে প্রদেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেই প্রদেশ পুরোটা পাকিস্তানের মধ্যে আসবে। কিন্তু কংগ্রেস এর দাবি ছিল যে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগ করতে হবে। ইংরেজরা ভারতের দিকে ঝুঁকে ছিল। তাদের দাবি মেনে নিল। তাই এখানে জিন্নাহকে দায় দেওয়া অনুচিত। জিন্নাহর হাতে তো সেনাবাহিনী ছিল না যে ইংরেজ থেকে জোর করে আদায় করে নিবে। আর খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট (বৃহত্তর খুলনা)- এই তিন জেলা ভারতের মধ্যে পড়েছিল। জিন্নাহ এই তিন জেলার সাথে মুর্শিদাবাদ অদল বদল করে নেন। বৃহত্তর খুলনা ভারতের মধ্যে গেলে বাংলাদেশ বিশাল সমুদ্রসীমা হারাত, বন্দর হারাত, সেই সাথে চারদিক দিয়ে ভারত দিয়ে ঘেরাও হয়ে যেত। মালদাহকে দুই ভাগ করা হয়। চাপাইনবাবগঞ্জ পাকিস্তানের ভেতরে আসে। হিন্দু এলাকা ভারতে যায়।
★ জিন্নাহর বিরুদ্ধে আমাদের দেশের বাম ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের কাছে থেকে দুইটি অভিযোগ হরহামেশা শোনা যায়: একে তো তিনি ভারত বিভক্তির খলনায়ক। জিন্নাহর একগুঁয়েমি এবং 'দ্বি-জাতি তত্ত্বের' (Two-Nation Theory) কারণেই অখণ্ড ভারত বিভক্ত হয়েছিল এবং লাখ লাখ মানুষকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার হতে হয়েছিল।
জবাবঃ ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক আধুনিক ইতিহাসবিদের মতে (যেমন আয়েশা জালাল তাঁর The Sole Spokesman গ্রন্থে দেখিয়েছেন), জিন্নাহ শুরু থেকেই দেশভাগ চাননি। তিনি মূলত অখণ্ড ভারতের অধীনে মুসলিমদের জন্য শক্তিশালী স্বায়ত্তশাসন এবং সংবিধানে পর্যাপ্ত রাজনৈতিক অধিকার চেয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় একক ক্ষমতার নীতি এবং গান্ধি-জওহরলাল নেহরুর কিছু সিদ্ধান্তের কারণে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা জিন্নাহকে পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে অনড় হতে বাধ্য করে। একটি উদাহরণ পেশ করলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে, আর তা হলোঃ ১৯৩১ সালে লন্ডনে (৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে মহাত্মা গান্ধী এই বৈঠকে যোগ দেন । ঐ বৈঠকে ড. বি আর আম্বেদকর দলিত বা অনুন্নত শ্রেণীর (Depressed Classes) জন্য পৃথক নির্বাচনের দাবি জানান। অন্যদিকে, মুসলিম লীগ, শিখ এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীও নিজেদের জন্য আলাদা রাজনৈতিক সুরক্ষার দাবি তোলে। গান্ধী একক ভাবে দাবি করেন যে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস একাই সমগ্র ভারতের (হিন্দু, মুসলিম, দলিত নির্বিশেষে) প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি দলিতদের জন্য আলাদা নির্বাচনের তীব্র বিরোধিতা করেন, কারণ তিনি মনে করেন, এটি হিন্দু সমাজকে চিরতরে বিভক্ত করে দেবে। ফলে বৈঠকটি ব্যর্থ হয়ে যায়। জিন্নাহ সাহেব তখন সখেদে বলেছিলেন, গোলটেবিল বৈঠকে হিন্দু মনোভাব, মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বুঝলাম, কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ শাসনের বুলি মূখ্যত ছিল হিন্দুরাজ্য প্রতিষ্ঠার-ই নতুন চাল। এর কিছুদিন পরেই জিন্নাহ কংগ্রেস ছেড়ে মুসলিম লীগে যোগ দেন।
★ জিন্নাহর বিরুদ্ধে যে উদ্ভট অভিযোগ বামপন্থীদের কাছ থেকে সবসময় শোনা যায় সেটা হলো, তিনি উগ্র ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক নেতা ছিলেন।
জবাব: ব্যক্তিজীবনে জিন্নাহ ছিলেন অত্যন্ত আধুনিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারার মানুষ। রাজনীতিতে আসার পর দীর্ঘ সময় তিনি "হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত" হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট পাকিস্তানের গণপরিষদে দেওয়া তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি পরিষ্কার বলেছিলেন: "আপনারা স্বাধীন; আপনারা আপনাদের মন্দিরে যাওয়ার জন্য স্বাধীন, আপনারা আপনাদের মসজিদে বা পাকিস্তানের এই রাষ্ট্রে অন্য যেকোনো উপাসনালয়ে যাওয়ার জন্য স্বাধীন। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ধর্মের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।" অর্থাৎ, তিনি থিওক্র্যাটিক (ধর্মীয় একনায়কত্ব) নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র চেয়েছিলেন।
জিন্নাহ শুধু উপমহাদেশের মুসলমানদের না, সারা বিশ্বের মুসলমানের মধ্যে আলোড়ন তৈরি করেন। পুরো মুসলমান বিশ্ব জন্মের আগেই পাকিস্তানের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিলো। ফিলিস্তিনের বিপদ তখনো শুরু হয়নি, তবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ আশু বিপদ টের পেয়ে ফিলিস্তিন ইস্যুতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন৷ ১৯৪৬ সালে কায়েদে আজম কায়রো সফরে গেলে ফিলিস্তিনের গ্রান্ড মুফতি মুহাম্মদ আমিন আল হুসাইনি, মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল বান্না, আরব লীগের সেক্রেটারি আব্দুল রহমান আযামসহ পুরা আরব বিশ্বের প্রতিনিধি আসেন কায়েদে আজমের সাথে দেখা করতে।
সুতরাং এমন একজন জাতীয়তাবাদী মুসলিম লিডারের ইতিহাস না জেনে না বুঝে কিংবা কারো ভাড়াটে হিসেবে মাত্রাতিক্ত বাড়াবাড়ি মোটেও কাম্য হতে পারেনা। ভারত বিভাগের আগে বাংলাভাষী মুসলমানদের দুর্দশা কোন স্তরে নেমে গিয়েছিল তা আজকের চকচকে পোষাক পরা বাঙালী সাহেবরা না জানলেও সমসাময়িক মানুষের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে। প্রিন্সিপাল ইবারাহীম খাঁ লিখেছেন :- “ছোটবেলায় আমাদের হিন্দু প্রতিবেশীদের আলাপ করতে শুনেছি, বদরগঞ্জে ৫০/৬০ ঘর ভদ্রলোক আছে বাকি সব মুসলমান। অর্থাৎ মুসলমান বলে কতগুলো জীব এ দেশে থাকলেও কিছু হিন্দু প্রতিবেশীর চোখে ভদ্র নামের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি।"( সূত্র: আধুনিক জগতের অন্যতম বিষ্ময় কায়েদে আযম)। আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন- "জানিলাম আমাদের মুরুব্বিদের ‘তুমি’ বলা ও কাছারীতে বসিতে না দেয়ার কারন একটাই: নায়েব- আমলারা মুসলমানদের ঘৃণা-হেকারত করেন, ভদ্রলোক মনে করতো না।" জনাব আবুল মনসুর আহমদ তাঁর “রাজনীতির পঞ্চাশ বছর“ বইতে লিখেছেন- “বাংলার জমিদার হিন্দু, প্রজা মুসলমান। বাংলার মহাজন হিন্দু, খাতক মুসলমান। উকিল হিন্দু, মক্কেল মুসলমান। ডাক্তার হিন্দু, রোগী মুসলমান। হাকিম হিন্দু, আসামি মুসলমান। খেলোয়াড় হিন্দু, দর্শক মুসলমান। জেলার হিন্দু, কয়েদি মুসলমান। তিনি বলেন, বাঙালী মুসলমানের সেই দিনগুলো ছিল চরম দুঃস্বপ্নের দিন। অধঃপতিত মুসলমানরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে হিন্দুদের কাছে তাচ্ছিল্যপূর্ণ ঘৃণ্য ব্যবহার পেত, তাদের মানুষ বলেও মনে করা হতনা। ঐতিহাসিক উইলিয়াম হান্টার তৎকালীন মুসলমানদের জন্য দুঃখ করে লিখেছিলেন- "কলকাতায় এমন সরকারি অফিসের সংখ্যা ছিলনা বললেই চলে যেখানে একজন মুসলিম, বাহক, পিয়ন-পেয়াদা, দোয়াত ভরার বা পেন্সিল কাটার কাজের চাইতে বড় কোন কাজ আশা করতে পারতেন।"
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাংলাভাষী মুসলমানদের এই অবমাননা ও অমর্যদার লানত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। জিন্নাহর উচ্চারিত We are a Nation অর্থাৎ ভিন্ন জাতিসত্তাই আমাদের একটা দেশ দিয়েছে, স্বাধীনতা দিয়েছে, বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সুযোগ করে দিয়েছে। তা না হলে বাংলাদেশের মুসলমানরা আজ লাঙ্গলের পিছনেই পড়ে থাকত। খদ্দর নয়তো গেরুয়াদের লাথির ভয়ে রামধুন গাইত, নয়ত জয় শ্রীরামে গলা মিলাতো। যারা জিন্নাহ সাহেবের দ্বিজাতি তত্ব ভুল ছিল বলছেন, তাদের বলি: ভারতের কোন নেতাকে প্রশ্ন করে দেখুন: দেশ ভাগের সময় ভারত তো বহুজাতিক স্যেকুলার রাজ্য হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্রিটিশ ভারতের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৭৭ শতাংশ বাগিয়ে নিয়েছিল এবং মাত্র ২৩ শতাংশ অংশ পাকিস্তান পেয়েছিল। সেই স্যেকুলার ভারত আজ মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩% ব্রাহ্মণ্য হিন্দুর “হিন্দুভারত” হয়ে গেল কি করে? গত ৭৯ বছরে হিন্দু ভারতে মুসলিম নিধন দাঙ্গা, মুসলমানদের গণপিটুনি, রেপ কেস, বুলডোজার চালিয়ে বাড়িঘর, মসজিদ নিধন এত ঘটেছে যে এখন সঠিক রেকর্ডও পাওয়া যায়না! সেক্যুলার ভারতে বিজেপির মত ধর্মান্ধ, ফ্যানাটিক হিন্দু দল সারা ভারতে ক্ষমতা দখল করে আছে কি করে? এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর খুঁজুন নিজেই উত্তর পেয়ে যাবেন জিন্নাহ সাহেবের টু নেশন থিওরি কত দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ছিল।
লেখক পরিচিতি:
কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।