
মাতারবাড়ী ব্যবহারের সুযোগ হতে পারে ভারতের
অনলাইন ডেস্ক: অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশে নতুন সরকারের পাশে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে জাপান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি স্পষ্ট বলেছেন, আগামী ৫ বছরে অর্থাৎ এই সরকারের মেয়াদকালে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন (৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ হতে পারে।
তবে জাপানের এই ইতিবাচক বার্তাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগাতে হলে অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি প্রয়োজন বলে মনে করেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, কানেকটিভিটি জোরদার, জ্বালানি ও শিল্প খাতে সহযোগিতার বিস্তর প্রতিশ্রুতি মিলেছে। বিশ্লেষকরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে খুবই সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেছেন।
তাঁরা বলছেন, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর দেওয়া যৌথ ঘোষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ‘বিগ-বি’ প্রসঙ্গ। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে এ বিগ-বি সামনে আরও গুরুত্ব পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
একইসঙ্গে বিগ-বিতে জাপানের দিক থেকে ভারতকে যুক্ত করার আকাঙ্ক্ষার প্রসঙ্গটিও সামনে এসেছে। এক্ষেত্রে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারে টোকিও।
বাংলাদেশের মহেষখালী দ্বীপে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ঘিরে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করতে জাপানের আগ্রহ বেশি। এটাকে জাপান বিগ-বি অর্থাৎ বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট বলে অভিহিত করে থাকে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক হাবে পরিণত করার জন্য দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে সংযুক্ত করার প্রতি জোর দিয়েছেন। বাংলাদেশের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কার্যকর রাখতে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে কানেকটিভিটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বাংলাদেশে স্পন্দনশীল গণতন্ত্রের প্রশংসা করেছেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সফল নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়েছেন।
নির্বাচনকে তিনি বলেছেন ‘বিশ্বাসযোগ্য’ এবং ‘শান্তিপূর্ণ’। জাপানি পর্যবেক্ষকরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘জাপান আগামী ৫ বছরে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে। ৫টি পেট্রোল বোট দেবে বলেও জানিয়েছে। ইপিএ বাস্তবায়নের কথাও তারা বলেছে। বিগ-বি তাদের অগ্রাধিকার। এই খাতে বড় বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের তরফে জাপানকে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে। জাপানের বিনিয়োগে আগ্রহ আছে। কিন্তু বাংলাদেশকে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন করতে হবে।
সাবেক এই রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর বাংলাদেশের প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করবে। কিন্তু এই বিনিয়োগ পেতে আমরা অভ্যন্তরীণভাবে কতটা প্রস্তুত। জ্বালানি, অবকাঠামো খাতে সহায়তার প্রতিশ্রুতি অবশ্যই ইতিবাচক।
জাপানে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত আশরাফ উদ দৌলা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির অনেক কথাবার্তা হয়েছে। জ্বালানি, কানেকটিভিটি এবং বিগ-বি প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। অর্থনীতি, মানবসম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তি প্রভৃতি বিষয়ে সহযোগিতার বিষয় খুবই ইতিবাচক।
সাবেক এই কূটনীতিক অবশ্য বলেছেন, বিগ-বি নিয়ে অগ্রসরের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার দিকটি সচেতনভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। জ্বালানি, অবকাঠামো এবং আইসিটি খাতে আগামী পাঁচ বছরে ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জাপান থেকে একটি প্রতিনিধিদল শিগ্গিরই বাংলাদেশে আসবে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি বিষয়ে অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তার মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছে বিগ-বি। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ঘিরে বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেষখালীর উন্নয়ন সাধনের কথা তিনি বলেছেন। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর জাপানের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় তৈরি করা হচ্ছে।
জাপানি প্রধানমন্ত্রী একটি অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক গড়ে তোলার প্রতি জোর দিয়েছেন। এই আগ্রহের লক্ষ্য হলো, অভিন্ন সমৃদ্ধি অর্জনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা। শান্তি ও স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্ক জোরদারে প্রয়োজন কানেকটিভিটি এবং অবকাঠামোর উন্নয়ন। আর এসবের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিনিয়োগ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠক এসব ক্ষেত্রে খুবই ইতিবাচক। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন, যাতে বাংলাদেশের মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে বিনিয়োগ করা জাপানের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। সফরকালে গৃহীত সিদ্ধান্ত উভয় ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন হলে সফরটি সত্যিকার অর্থে ফলপ্রসূ বলে বিবেচিত হতে পারে।বা:প্র