
লেখক-আবু রাশেদ মুহাম্মদ মহিউদ্দিন ছিদ্দিকী।
================================
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল চট্টগ্রাম ইসলামি দাওয়াত, আধ্যাত্মিকতা ও তাসাউফের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের ধারক। এই অঞ্চলের বহু পীর-আউলিয়া তাঁদের জ্ঞানের আলো, তাকওয়া ও দাওয়াতের মাধ্যমে সমাজকে নবজাগরণের পথে এনেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন গারাংগিয়ার “বড়হুজুর” নামে সুপরিচিত হযরত শাহ মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ (রহঃ)। তিনি ভারতের প্রখ্যাত সূফী হাফেজ হামেদ হাসান আজমগড়ী (রহঃ) এর বিশিষ্ট খলিফা ছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে শুদ্ধ আকিদা ও সুন্নিয়তের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।
তাঁর সমগ্র জীবন ছিল কুরআন-সুন্নাহনির্ভর, তাসাউফের শুদ্ধ ধারায় পরিচালিত এবং সমাজসংস্কারে নিবেদিত। নিচে তাঁর জীবনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো কোরআন-হাদিসের আলোকে উপস্থাপন করা হলো।
হযরত শাহ মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ (রহঃ)-এর জন্ম চট্টগ্রামের গারাংগিয়া গ্রামে। পারিবারিকভাবে তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিক বংশধারার উত্তরসূরি; ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর ছিদ্দিক (রাঃ) এর বংশধর। আরব হতে বাংলায় দ্বীন প্রচারে আগত বংশ পরম্পরায় তাঁর পিতা হযরত শাহসূফি মুহাম্মদ আলাউদ্দিন ছিদ্দিকী (রহঃ) ছিলেন দুনিয়া বিমুখ, নিরহংকারী আল্লাহর এক নিবেদিতপ্রাণ ওলী। যিনি নিজের সাধারণ জীবনেও বহু করামতের অধিকারী ছিলেন। শৈশব থেকেই বড়হুজুর দ্বীনি শিক্ষার্জন শুরু করেন এবং তৎকালীন সময়ে কোরআন-হাদিসের উপর জ্ঞানার্জন শেষে চট্টগ্রাম দারুল উলুম আলীয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করেন।
আর্থিক প্রতিকূলতা সত্বেও উচ্চতর শিক্ষার্জনের উদ্দেশ্যে কলকাতা যাওয়ার মনস্থির করেন। সরকারী “কাজী” পদে আবেদন করলে তৎকালীন বৃটিশ সরকার তাঁকে নিয়োগ পত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু তাঁর মহীয়সী মায়ের আপত্তি এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি নিজ গ্রামে ১৯২০ সালে গারাংগিয়া আলীয়া মাদরাসার সূচনা করেন। মাদ্রাসাটি পরবর্তীতে দ্রুত প্রসার লাভ করে এবং তরুণ প্রজন্মকে ইসলামের শিক্ষায় পরিপুষ্ট করে। পরবর্তী বছর হযরত শাহ সুফি আজমগড়ী (রহঃ)-এর সান্নিধ্যে এসে তাসাউফ ও শুদ্ধ আকিদার পথে অগ্রসর হন।
হযরত বড়হুজুর (রহঃ)’র প্রতি সুনজর এবং অতি দ্রুত উন্নতি সাধনের ফলে ১৯৪৪ সালে আজমগড়ী হযরত তাঁকে তরিক্বতের খেলাফত প্রদান করেন এবং পরবর্তীতে গারাংগিয়ায় ইসলামী শিক্ষা ও দাওয়াতের কেন্দ্র (খানকাহ) স্থাপন করেন। তাঁর শিক্ষাদর্শ ছিল আল্লাহভীতি, জ্ঞানচর্চা ও আখলাকে রাসূল (সঃ) অনুসরণ। কুরআনে কারীমে আল্লাহ পাক বলেন- “যাদেরকে আমরা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করি, তারা নামাজ কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে, সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করে।” -(সূরা আল-হাজ্জ: ৪১)। বড়হুজুর (রহঃ) এই আয়াতের বাস্তব রূপ; তিনি সমাজে ইসলামি শিক্ষা ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায় অবিচল ছিলেন।
ঠিক তেমনি তাসাউফ ও আধ্যাত্মিক সাধনায় বড় হুজুর (রহঃ) ছিলেন একান্ত গোপন ও নিভৃতচারী। তাসাউফের মূল উদ্দেশ্য হলো আত্মশুদ্ধি, নফস পরিশুদ্ধ করা এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ। বড়হুজুর (রহঃ) জীবনে তাসাউফকে বাস্তবায়ন করেছিলেন নববী মানসে। তিনি ছিলেন ইখলাসে পরিপূর্ণ ও আল্লাহর স্মরণে নিবেদিতপ্রাণ। তাঁর তাসাউফের বৈশিষ্ট্য ছিল তিনটি স্তম্ভে প্রতিষ্ঠিত-
১. শরীয়তের পূর্ণ অনুসরণ,
২. অন্তরের পরিশুদ্ধতা,
৩. মানুষের কল্যাণে কাজ।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন: “নিশ্চয়ই দেহে একটি মাংসপিণ্ড আছে; সেটি শুদ্ধ হলে পুরো দেহ শুদ্ধ হয়, আর তা নষ্ট হলে পুরো দেহ নষ্ট হয়- সেটি হলো ক্বলব (হৃদয়)।” (সহিহ বুখারী, হাদিস: ৫২)। বড়হুজুর (রহঃ) এই হাদীসের বাস্তব উদাহরণ ছিলেন। তাঁর হৃদয় ছিল আল্লাহর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ এবং তিনি মুরিদদের হৃদয়কেও ঈমানের আলোয় আলোকিত করতেন।
বড়হুজুর (রহঃ) সুন্নী আকিদার প্রতি ছিলেন আপসহীন। তিনি সর্বাবস্থায় কুরআন ও রাসূল (সঃ)- এর সুন্নাহকে একমাত্র পথপ্রদর্শক হিসেবে মেনে চলতেন। তাঁর নসিহত, দাওয়াত ও ফতোয়াসমূহে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মৌলিক নীতিই ছিল মূলধারা। আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” -(সূরা আল-আহযাব: ২১)। তিনি সর্বদা বলতেন- “রাসূলের পথে চলা মানেই সত্য তরিকায় থাকা।” তাঁর পোশাক, আমল ও আখলাকে নববী অনুকরণ স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হতো।
আউলিয়ায়ে কেরামের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা বা করামত আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। বড়হুজুর (রহঃ)’র জীবনেও বহু আধ্যাত্মিক ঘটনা ঘটেছে, যা প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁর শিষ্য ও ভক্তরা। দৈনিক পূর্বকোণ-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে- “তাঁর এত বেশি করামত ছিল যে, তা নিয়ে আলাদা গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব।” অনেক সময় দেখা যেত, তিনি মুরিদদের কষ্টের পূর্বাভাস দিতেন এবং দোয়ার মাধ্যমে সমাধান করতেন। কেউ অসুস্থ হলে তাঁর ফুঁক ও দোয়া আল্লাহর ইজাজতে আরোগ্য দিত। এসব ঘটনা প্রমাণ করে- “নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুদের জন্য কোনো ভয় নেই, তারা শোকগ্রস্তও হবে না।” -(সূরা ইউনুস: ৬২)
হযরত বড়হুজুর (রহঃ) শুধু খানকা কেন্দ্রিক পীর ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক সমাজ সংস্কারক ও দাওয়াতি মুজাহিদ। তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় নিজ গৃহের বাহিরে দ্বীনের কল্যাণে কাটিয়েছেন। তাঁর দাওয়াতের মূল বার্তা ছিল- “মানুষকে আল্লাহর পথে ফিরিয়ে আনো, সুন্নতের পথে দাঁড় করাও।” তিনি নিয়মিত তাবলীগ, ওয়াজ ও মজলিসে কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা দিতেন। তাঁর নসিহত ছিল জ্ঞান ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ; কোনো ঘৃণা নয়, বরং আহ্বান ছিল করুণাময় ও যুক্তিসঙ্গত।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন: “তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে কুরআন শিক্ষা নেয় এবং তা শিক্ষা দেয়।” -(সহিহ বুখারী, হাদিস: ৫০২৭)। এই আদেশ বাস্তবায়নে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন গারাংগিয়া আলীয়া মাদরাসা, যা আজও ইসলামী শিক্ষার আলোকবর্তিকা। সহস্রাধিক ছাত্র তাঁর তত্ত্বাবধানে আলেম ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে গড়ে ওঠে। “তিনি মাদ্রাসার খেদমতের পাশাপাশি তাবলীগে ত্বরিকতের খেদমতে দেশের বিভিন্ন স্থানে গমন করতেন; ফলশ্রুতিতে অসংখ্য লোক আল্লাহ ও রাসূলের নৈকট্য লাভে সক্ষম হয়েছিলেন”। অর্থাৎ, বিপথগামী, তান্ত্রিক-মনের মানুষেরাও তাঁর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আল্লাহর পথে ফিরে আসতে পেরেছিল। তাঁর প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য এতিমখানা, হেফজখানা, মসজিদ ও খানকাহ, যা অসহায় মানুষের মধ্যে ঈমান ও শিক্ষা ছড়িয়ে দিয়েছে। বড়হুজুর (রহ.)’র জীবন ছিল শরীয়ত-কেন্দ্রিক ত্বরিকতের নিদর্শন, এবং তার সৃষ্টির ফলে অসংখ্য উচ্চাঙ্গের আলেম, মুহাদ্দিস, সুফি ও দরবেশ গড়ে উঠেছে- লক্ষ লক্ষ মুরিদ তাঁর ওসিলায় সফল হয়েছে। তাঁর এমন বিচিত্র অবদান একনিষ্ঠ অনুগ্রহের ফল, যা পরবর্তী প্রজন্মেরও পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।
নৈতিকতা, তাকওয়া ও ইখলাসের দৃষ্টান্তে হযরত বড়হুজুর (রহ.) ছিলেন একান্ত পরহেজগার ও তাকওয়ার অধিকারী। তিনি দুনিয়ার চাহিদা থেকে বিমুখ হয়ে সুন্নাতের প্রতি দৃঢ় আনুগত্য বজায় রাখতেন, জাগতিক জীবনের মোহ ত্যাগ করে আল্লাহর সেবা ও ভাল কাজকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এই কারণেই দেশে-বিদেশের সকল আকিদার আলেম-ওলামাগণ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং তাঁকে দেখলে সর্বদা দোয়ার প্রার্থী হতেন। অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন, অসহায়ের প্রতি সহমর্মিতা ও সমঝদারিত্ব তাঁর পরিচয়ের অংশ ছিল। তাঁর সততা ও ন্যায্যতার নমুনা ছিল ১৯৫২ সালের একটি ঘটনা: পাবলিক (বোর্ড) পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গারাংগিয়া মাদরাসায় ঘটে যাওয়া ঘটনায় তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হন। তিনি চেয়েছিলেন শুধু সত্যিকারের শিক্ষার্থীরাই পরীক্ষায় অংশ নিক, তাই অসদাচরণ (নকল রত) দেখার পর নিজ উদ্যোগে পরীক্ষা কেন্দ্র বন্ধ করে দেন।
বড়হুজুর (রহঃ)’র জীবন ছিল তাকওয়া, ধৈর্য ও ইখলাসে ভরপুর। তিনি বলতেন- “আল্লাহভীতি ছাড়া জ্ঞান বৃথা, আর ইখলাস ছাড়া ইবাদত অকার্যকর।” তাঁর আখলাক এত সুন্দর ছিল যে, শত্রুও তাঁর চরিত্রের প্রশংসা করত। তিনি কখনো গীবত, অহংকার বা বিতর্কে জড়াতেন না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন: “আমি তো মহৎ চরিত্র সম্পূর্ণ করার জন্যই প্রেরিত হয়েছি।” -(মুয়াত্তা মালিক, হাদিস: ১৬১৪) তাঁর প্রতিটি কাজেই এই নববী চরিত্রের প্রতিফলন ঘটত- সদাচরণ, বিনয়, দানশীলতা ও ধৈর্য।
বড়হুজুর (রহঃ) বিশ্বাস করতেন- “দ্বীন ও সমাজের উন্নয়ন একসাথে না ঘটলে কোনো জাতি টিকবে না।” তাঁর মাদরাসা, এতিমখানা ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা ছিল মানবকল্যাণমূলক উদ্যোগের প্রতিফলন। তিনি দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলে শিক্ষা ছড়িয়ে দিয়েছেন, ছাত্রদের জন্য বিনামূল্যে থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। এতে প্রতিফলিত হয় কুরআনের নির্দেশ- “তোমরা ন্যায় ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা কর।” -(সূরা মায়িদা: ২)
আজও গারাংগিয়া দরবারে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ইসলামের সুন্নতের আলোকে জীবন সাজানোর অনুপ্রেরণা খোঁজে। শাহ্ আব্দুল মজিদ (রহ.)’র আলোকিত পথচলা আমাদের শেখায় সত্য, ভ্রাতৃত্ব এবং সৎ জীবনের গুরুত্ব; আল্লাহ তায়ালা কুরআন ও হাদীসে যেভাবে নৈতিকতা, সংসারিক ও সামাজিক দায়িত্বের ওপর জোর দিয়েছেন, তিনি তাঁর পূর্ণ অনুবর্তিতা করে গেছেন। তাঁর জীবন আজো বহু মানুষের জন্য “সরাসরি কুরআনের জীবন্ত ছবি” হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। আজকের বিভ্রান্ত সময়েও বড়হুজুর (রহঃ)’র জীবন আমাদের জন্য এক আলোকিত দিকনির্দেশনা।
বড়হুজুর হযরত শাহ মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ (রহঃ) ছিলেন কুরআন ও সুন্নাহর জীবন্ত দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়- আধ্যাত্মিকতার মূল হলো শরীয়তের অনুশাসন; সুন্নিয়তের অর্থ হলো রাসূল (সঃ)’র আদর্শে জীবন গঠন; এবং পীরের মর্যাদা নিহিত থাকে ইখলাস, তাকওয়া ও সেবায়।
তাঁর শিক্ষা, তাসাউফ ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রম প্রমাণ করে- তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে এক হক্কানি আলেম, আধ্যাত্মিক সাধক এবং সুন্নিয়তের অনন্য নিদর্শন।
================================
লেখক: আবু রাশেদ মুহাম্মদ মহিউদ্দিন ছিদ্দিকী; কবি, কলামিস্ট ও পিএইচডি গবেষক, মালয়েশিয়া।










