লেভেল প্লেইং নিশ্চিতে মাঠে থাকবে একাধিক বাহিনী পোস্টার নিষিদ্ধ, সীমিত বিলবোর্ড, এনআইডি-মোবাইল নম্বর সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা, প্রচারে থাকবেন না অতি গুরুত্বপূর্ণ বা ভি.ভিআইপি ব্যক্তিরা
অনলাইন ডেস্ক: দীর্ঘ এক দশক দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর এবার নির্দলীয় প্রতীকে ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন ব্যবস্থাকে সামনে রেখে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্য পৃথক আচরণবিধি জারি করেছে কমিশন। এতে প্রচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার, ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, সরকারি সুবিধার ব্যবহার, শোডাউন ও মাইকিং, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
ইসি জানায়, ২০১৬ সালের আচরণবিধির পরিবর্তে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব বিধিমালা করা হয়েছে। নির্বাচনী মাঠে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, প্রভাবমুক্ত পরিবেশ তৈরি এবং প্রচারে অর্থ ও পেশিশক্তির অপব্যবহার ঠেকানোই নতুন আচরণবিধির অন্যতম লক্ষ্য। নতুন আচরণবিধি অনুযায়ী : প্রচারে পোস্টার নয়, সীমিত বিলবোর্ড, পাঁচ ধরনের নির্বাচনে আলাদা বিধান, দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাইক ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, ভোটকেন্দ্রে অস্ত্র-বিস্ফোরক নিষিদ্ধ, এআই ব্যবহারে কড়াকড়ি, ভোটারকে প্রভাবিত করতে অর্থ ও বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ, এনআইডি ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞাসহ আচরণবিধিতে বেশ কয়েকটি পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, নতুন আচরণবিধির অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা। তবে প্রচারসামগ্রীর আকার ও ব্যবহার নির্দিষ্ট করে ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে কমিশন। এক প্রজ্ঞাপনে ইসি জানিয়েছে, ব্যানারের সর্বোচ্চ আকার ১০ ফুট বাই ৪ ফুট, লিফলেট ও হ্যান্ডবিল এ-ফোর আকারের অর্থাৎ ৮ দশমিক ২৭ ইঞ্চি বাই ১১ দশমিক ৬৯ ইঞ্চি হতে পারবে। ফেস্টুনের সর্বোচ্চ আকার ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি এবং বিলবোর্ডের প্রচার অংশের সর্বোচ্চ আকার ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রচারসামগ্রী সাদা-কালো হতে হবে। ফেস্টুন ও হ্যান্ডবিলে পলিথিনের আবরণ বা পিভিসি ব্যবহার না করা, প্রতিটি প্রচারসামগ্রীতে মুদ্রণের তারিখ উল্লেখ করা, কোনো প্রতীকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা ৬ ফুটের বেশি না করা এবং নির্বাচনী প্রচারে জীবন্ত প্রাণী ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নির্বাচনের ধরন অনুযায়ী বিলবোর্ড, নির্বাচনী ক্যাম্প ও মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পৃথক সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইউপি নির্বাচনে প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। আগে ইউপি নির্বাচনে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ না থাকলেও নতুন বিধিমালায় সীমিত পরিসরে তা যুক্ত করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ইউনিয়ন বা পৌর ওয়ার্ডে একটি করে এবং পুরো নির্বাচনী এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। নির্বাচনী ক্যাম্পের সংখ্যাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে একটি, প্রতি ইউনিয়নে একটি এবং পৌরসভা এলাকায় প্রতি তিন ওয়ার্ডে একটির বেশি ক্যাম্প স্থাপন করা যাবে না। একইভাবে পৌরসভা নির্বাচনে প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি থানা বা উপজেলায় একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। তবে জেলা পরিষদ নির্বাচনে মাইক ব্যবহারের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। নির্বাচনী প্রচারে মাইক বা শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহারের সময়ও কঠোরভাবে নির্ধারণ করেছে কমিশন। একই সময়ে একটির বেশি মাইক ব্যবহার না করে দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাইক ব্যবহার করা যাবে। তবে জেলা পরিষদ নির্বাচনে মাইক ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। শব্দবর্ধক যন্ত্রের শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ৬০ ডেসিবেলের মধ্যে রাখতে হবে। নতুন আচরণবিধিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নির্বাচনী প্রচারের আওতায় আনা হয়েছে। প্রার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাতে পারবেন, তবে এর জন্য যে অর্থ ব্যয় হবে তা নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে দেখাতে হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য, বিকৃত ছবি কিংবা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা ভোটারদের বিভ্রান্ত করার সুযোগও সীমিত করেছে কমিশন। নতুন আচরণবিধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা। কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ভোটারের নিজের কিংবা পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের এনআইডি ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ ওঠার পর এবার এবারের নির্বাচনের আচরণবিধিতে এমন কর্মকা- সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী বা সমমর্যাদার ব্যক্তি, সংসদ সদস্য এবং সিটি মেয়র রয়েছেন। এ ছাড়া মেয়রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রশাসকরাও নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না। প্রার্থী ছাড়া চেয়ারম্যান, মেয়র, প্রশাসক বা স্থানীয় সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণেও নিষেধাজ্ঞা রাখা হয়েছে। সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নির্বাচনী এলাকায় কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচার কিংবা নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না। ধর্মীয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রচারের ক্ষেত্রেও আচরণবিধি প্রদান করেছে ইসি। আচরণবিধি অনুযায়ী মসজিদ, মন্দির, ক্যায়াং, প্যাগোডা, গির্জা বা অন্য কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে নির্বাচনী প্রচার চালানো যাবে না। একইভাবে সরকারি অফিস কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নির্বাচনী প্রচারণা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে শিক্ষা কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিঘœ সৃষ্টি না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ নির্বাচনী কাজে ব্যবহার করা যাবে। ভোট আদায়ের জন্য অর্থ বা উপহার দেওয়ার পাশাপাশি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেও ভোটারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্বাচন উপলক্ষে কোনো নাগরিকের জমি, ভবন কিংবা অন্য কোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করা যাবে না। অনভিপ্রেত গোলযোগ, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ বা অন্য কোনো উপায়ে নাগরিকের শান্তি বিনষ্ট করাও আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। নির্বাচন কমিশনের অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ ভোটকেন্দ্রের নির্ধারিত সীমানার মধ্যে অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক বা বিস্ফোরক দ্রব্য বহন করতে পারবেন না। প্রচলিত অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে সংজ্ঞায়িত সামগ্রী এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে।
নতুন আচরণবিধি সংযোজনের পাশাপাশি বিধি লঙ্ঘনেও কঠোর অবস্থানে নির্বাচন কমিশন। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদ- এবং অর্থদ-ের বিধান রাখা হয়েছে। ইউপি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদ-ের পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান বহাল রয়েছে। গুরুতর অনিয়ম, পেশিশক্তির ব্যবহার, ভোটারকে প্রভাবিত করা কিংবা নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করার মতো ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইন ও বিধির সঙ্গে সমন্বয় রেখেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধি প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে একটি বিভাগের সব জেলার ইউনিয়ন পরিষদ একসঙ্গে নির্বাচন করার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। এর মূল যুক্তি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা। নির্দিষ্ট বিভাগে একসঙ্গে নির্বাচন হলে অন্য বিভাগ থেকে পুলিশ, প্রশাসন ও নির্বাচনসংশ্লিষ্ট জনবল এনে নিরাপত্তা জোরদার করা তুলনামূলক সহজ হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। প্রার্থীরা স্থানীয় হওয়ায় ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের প্রভাব বেশি থাকে এবং ভোটার উপস্থিতিও তুলনামূলক বেশি হয়। এই বাস্তবতায় সহিংসতা প্রতিরোধকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে ইসি। তফসিল ঘোষণার আগেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপের নির্বাচন যতটা সম্ভব নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আয়োজনের চেষ্টা থাকবে। এসময় বড় অনিয়ম ঘটলে পরের ধাপগুলোর নিরাপত্তা পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হতে পারে। প্রয়োজন দেখা দিলে পরবর্তী ধাপে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। প্রথম ধাপের অভিজ্ঞতাই পরের ধাপের প্রস্তুতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘদিন পর নির্দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রেক্ষাপটে নতুন আচরণবিধিকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও সমান সুযোগের করার লক্ষ্যেই এসব বিধান করা হয়েছে।ই