মিথ্যা মামলার আসামী হলে করণীয়….

এডভোকেট এম. সাদ্দাম হোসেন নীরব

সমাজ ও দেশে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা আইনের মূখ্য উদ্দেশ্য। আইনের আশ্রয় নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সুবিচার পাবে এটাই সবার প্রত্যাশা। কিন্তু মাঝে মাঝে দেখা যায় প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে হেয় করতে বা হয়রানি করতে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয় মিথ্যা মামলা হল এমন একটি অস্ত্র যা দিয়ে প্রতিপক্ষকে সহজেই ঘায়েল বা কাবু করা যায়। বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ক্ষেত্রে মারাত্মক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে অনেকেই মনে করেন মিথ্যা মামলা দিয়েছে এটাতে কিছুই হবে না। কিন্তু মিথ্যা মামলায় জড়িত হয়ে আপনি চুপ করে বসে থাকলে আপনার প্রতিপক্ষ মিথ্যা সাক্ষ্য প্রমাণ দিয়ে মামলার রায় তার পক্ষে নিয়ে যেতে পারে। তাই কেউ আপনার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করলে আপনি আইনি লড়াই যথাযথভাবে চালিয়ে সহজেই এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে পারেন।

তাই, আজকে আমি মিথ্যা মামলায় অন্যায়ভাবে আসামি হলে কিভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন এবং মিথ্যা মামলা আনয়নকারীর বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার পেতে পারবেন সে বিষয়ে আলোচনা করবোঃ

থানায় মামলা হলে করণীয় :
যদি আপনার বিরুদ্ধে থানায় মামলা (জিআর মামলা) হয় তাহলে প্রথমে এজাহারের কপিটি সংগ্রহ করুন। এরপর আইন ও আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মামলাটি আইন অনুযায়ী লড়ে যেতে হবে। আইনের চোখে আপনার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আপনি নিরপরাধ।
আইনের বিধান অনুযায়ী আপনি কেবল অভিযুক্ত অপরাধী নয়। তাই প্রাথমিকভাবে আপনি যেন এই মামলা সুষ্ঠুভাবে মোকাবেলা করতে পারেন সেই চেষ্টাই করতে হবে। এক্ষেত্রে আপনার বিশ্বস্ত একজনকে দিয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে আলোচনা করুন। যদি দলিলপত্র ও সাক্ষ্য-প্রমাণ ঠিক থাকে তাহলে মিথ্যা মামলা থেকে অবশ্যই রেহাই মিলবে।তদন্তকারী কর্মকর্তা ইচ্ছে করলে আপনাকে গ্রেফতার না করে মামলার বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে আপনাকে নির্দোষ দেখিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল কিংবা অভিযোগপত্রে আপনাকেও অব্যাহতি দিতে পারেন। যদি এমন হয় যে আপনি জানতে পারলেন না আপনার বিরুদ্ধে থানায় এজাহার হয়েছে। পুলিশ এসে আপনাকে গ্রেফতার করলো। তখন আপনাকে একজন ভালো বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন করতে হবে। যদি তদন্তকারী কর্মকর্তা রিমান্ডের আবেদন করেন তাহলে আপনার নিযুক্ত বিজ্ঞ আইনজীবীর উচিত হবে রিমান্ড বাতিলের জন্য বিজ্ঞ আদালতে আবেদন করা।আর আপনি গ্রেপ্তার না হলে একজন বিজ্ঞ আইনজীবী সঙ্গে আলোচনা করুন। মামলার এজাহার দেখতে হবে অভিযোগগুলো জামিনযোগ্য বা জামিন অযোগ্য কিনা।জামিনযোগ্য ধারার অভিযোগ হলে আপনি সহজে জামিনে মুক্তি পাবেন। অভিযোগ তেমন গুরুতর না হলে জামিন অযোগ্য ধারা হলেও আপনি বিজ্ঞ আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনে মুক্তি পেতে পারেন।

বাকি অংশঃ
জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর বিজ্ঞ আদালতে প্রতিটি ধার্য্য তারিখে নিয়মিত হাজির থাকার মাধ্যমে মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে যথাযথ আইনি উপযুক্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা হওয়ার পূর্বেও আপনি অব্যাহতি পেতে পারেন।

আদালতে মামলা হল করণীয় :
থানায় যদি মামলা না হয়, বিজ্ঞ আদালতে সিআর মামলা হয় তাহলে বিজ্ঞ আদালত আপনাকে সম্মান দিতে পারেন কিংবা আপনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট জারি) করতে পারেন। এক্ষেত্রেও আপনাকে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইতে হবে। আবার আদালতে মামলা হওয়ার পর আদালত সমন কিংবা ওয়ারেন্ট জারি না করে পুলিশ বা অন্য কোন সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশও দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট আপনি উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ দিয়ে আপনার বিরুদ্ধে যে মিথ্যা অভিযোগটি দায়ের করা হয়েছে, তা প্রমাণের চেষ্টা করুন। তদন্তকারী কর্মকর্তা আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা না পেলে আপনাকে নির্দোষ দেখিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে পারেন।

সাক্ষ্যপ্রমাণে আপনি নির্দোষ প্রমাণিত হলে মিথ্যা অভিযোগ কারী বা মামলা দায়েরকারীর বিরুদ্ধে আপনি দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় মামলা দায়ের করতে পারেন।

মিথ্যা মামলার আইনি প্রতিকারঃ
ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের ২৫০ ধারা মোতাবেক মিথ্যা নালিশ আনয়নকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ করা যায়। নালিশ অথবা এজাহার দায়ের মাধ্যমে আনীত কোন মামলায় বিচারকালে যদি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট এর নিকট মনে হয় যে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা বা ভিত্তিহীন এবং নগণ্য বা বিরক্তজনক, তাহলে বিচারকারী সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজদারী কার্যবিধির ২৫০ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ দিতে পারেন। এক্ষেত্রে বিজ্ঞ আদালতকে এই মর্মে সন্তুষ্ট হতে হবে যে মামলাটি স্বেচ্ছায় মিথ্যাভাবে রুজু করা হয়েছে এবং তা সুবিচারের জন্য রুজু করা হয়নি বরং আসামিকে হয়রানি করার লক্ষ্যে বা কোন উদ্দেশ্য হাসিল করার লক্ষ্যে আসামীর প্রতি চাপ সৃষ্টি করার জন্য দায়ের করা হয়েছে।

দন্ডবিধি আইনের ২১১ ধারা অনুযায়ী যদি কোন লোক অপর কোন লোকের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে আইনানুগ মামলা দায়ের করার কোনো কারণ নাই জানা স্বত্ত্বেও কোনো মিথ্যা মামলা দায়ের করে তাহলে উক্ত ব্যক্তি দুই বৎসর পর্যন্ত যে কোন মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দন্ডে দণ্ডিত হবে। এবং যদি উক্ত মিথ্যা মামলা কোনো মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে অথবা সাত বৎসর বা তার বেশি মেয়াদের কোনো কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ সম্পর্কে দায়ের করা হয় তাহলে দায়েরকারী ব্যক্তি সাত বৎসর পর্যন্ত যে কোন মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দন্ডিত হবে এবং তাকে অর্থ দন্ডে দন্ডিত করা যাবে। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হল, যে ব্যক্তি মিথ্যা অভিযোগ বা এজাহার দায়ের করেছিল সে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ২১১ ধারা অনুযায়ী মামলা করতে হলে, মামলাটি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হতে হবে।

একইভাবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৭ ধারায় মিথ্যা মামলা বা অভিযোগের দায়ে অপরাধীর সাত বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

পরিশেষে, আইন যথার্থভাবে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হোক, কোনো নিরপরাধ ও অসহায় মানুষ যাতে মিথ্যা মামলায় মিথ্যাভাবে জেলে না যায় বা হয়রানীর শিকার না হয় সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সবার জন্য শুভকামনায় আজ এখানেই ইতি টানলাম।

সমাজ ও দেশে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা আইনের মূখ্য উদ্দেশ্য। আইনের আশ্রয় নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সুবিচার পাবে এটাই সবার প্রত্যাশা। কিন্তু মাঝে মাঝে দেখা যায় প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে হেয় করতে বা হয়রানি করতে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। মিথ্যা মামলা হল এমন একটি অস্ত্র যা দিয়ে প্রতিপক্ষকে সহজেই ঘায়েল বা কাবু করা যায়। বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এক্ষেত্রে মারাত্মক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেকেই মনে করেন মিথ্যা মামলা দিয়েছে এটাতে কিছুই হবে না। কিন্তু মিথ্যা মামলায় জড়িত হয়ে আপনি চুপ করে বসে থাকলে আপনার প্রতিপক্ষ মিথ্যা সাক্ষ্য প্রমাণ দিয়ে মামলার রায় তার পক্ষে নিয়ে যেতে পারে। তাই কেউ আপনার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করলে আপনি আইনি লড়াই যথাযথভাবে চালিয়ে সহজেই এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে পারেন।

লেখক: এডভোকেট এম. সাদ্দাম হোসেন নীরব
আইনজীবী, জজ কোর্ট, চট্টগ্রাম
এক্স লেকচারার -পটিয়া আইন কলেজ, চট্টগ্রাম

মন্তব্য করুন